কবে থেকে আযানের প্রচলন?

শুক্রবার, জুন ৩, ২০২২

ঢাকা : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে মদীনা শহরে হিযরত করেন, তখন মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। মুহাম্মদ (সা.) নিয়মিত নামাজ আদায়ের জন্য ‘মসজিদ আল-নববী’ নির্মাণ করেছিলেন।

হিযরতের দ্বিতীয় বছরে মুসলমানদের সংখ্যা যখন আরো বেড়ে যায়; তখন তারা সম্মিলিতভাবে দিনে পাঁচবার জামাতে নামাজ পড়তেন। তাই যখন নামাজের সময় আসত, তখন যে সাহাবি মসজিদের কাছে থাকতেন, তিনি উচ্চস্বরে ঘোষণা করতেন ‘আস-সালাত উল-জামিয়াহ (জামাতে নামাজ পড়া হবে)। যারা এ ঘোষণা শুনতেন তারা নামাজে শরীক হতে আসতেন।

নামাজে অংশ নেওয়ার জন্য নিজেদের আহবানের একটি উত্তম উপায় খুঁজে বের করার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন সবাই। নবী করিম (সা.) তাঁর সাহাবীদের কাছে তাদের পরামর্শ চাইলে কেউ কেউ ঘণ্টা বাজানো বা আগুন জ্বালানোর পরামর্শ দিলেন।

যখন এমন আলোচনা ও চিন্তাভাবনা চলছিল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদেল রাবিহি নামে এক সাহাবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি গত রাতে একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখেছি।

তুমি কি স্বপ্ন দেখেছ- মুহাম্মদ (সা.) যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন। যায়েদ উত্তর দিলেন, আমি দেখেছি যে সবুজ পোশাক পরা এক ব্যক্তি আমাকে আযানের শব্দ শিখিয়েছে এবং আমাকে এই শব্দগুলোর মাধ্যমে লোকদেরকে নামাজের জন্য আহ্বান করার পরামর্শ দিয়েছে।

এরপর তিনি আযানের বাক্য পাঠ করলেন। কথাগুলো সুন্দর ও অর্থপূর্ণ ছিল। উমর ইবনুল খাত্তাবও (রা.) এসে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, গত রাতে আমার স্বপ্নে একজন ফেরেশতা আমাকে একই কথা শিখিয়েছিলেন।’

হযরত মুহাম্মদ (সা.) যায়েদের স্বপ্ন সত্য বলে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি যায়েদকে বললেন, বিলালকে আযানের কথাগুলো শেখাতে। বিলাল (রা.) একজন আফ্রিকান ক্রীতদাস ছিলেন, তাকে মুক্ত করে এনেছিলেন আবু বকর (রা.) । সে সময় আরবের লোকেরা নিজেদেরকে অন্য জাতির থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। নবী মুহাম্মদ (সা.) বিলালকে বেছে নিয়েছিলেন লোকেদের এটা দেখানোর জন্য যে- কোনো জাতিই অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়।

বিলাল (রা.) দাঁড়িয়ে আযান দিলেন এবং তার আওয়াজ গোটা মদীনা শহরে বেজে উঠল। তখন লোকজন তাড়াহুড়ো করে মসজিদে নববীতে এসে হাজির হন। মুহাম্মদের (সা.) নির্দেশে বিলালই প্রথম মদিনার মসজিদে নববীতে আযান প্রদান করেন।

নবী মুহাম্মদ (সা.) এই আযানকে নামাযের আহ্বানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। হিজরী প্রথম সনে আযানের প্রচলন হয়। এর আগে মুহাম্মাদ (সা.) মক্কায় থাকতে আযান ও ইক্বামাহ্ ছাড়া নামাজ পড়েছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যদি লোকেরা জানত যে আযান ও প্রথম কাতারে সালাত আদায়ে কী নেকি আছে, তাহলে তারা পরস্পর প্রতিযোগিতা করত। অনুরূপভাবে যদি তারা জানত এশা ও ফজরের সালাতে কী নেকি রয়েছে, তবে তারা হামাগুঁড়ি দিয়ে হলেও ওই দুই সালাতে আসত।’ (বুখারি, হাদিস: ৬১৫)

আযান (আরবি: أَذَان) (আহ্বান)। আর প্রতিটি মসজিদে একাধিক উচ্চস্বরে আযানের মূল উদ্দেশ্য হলো সবার কাছে ইসলামিক বিশ্বাসের সারসংক্ষেপ সহজে বোধগম্য করানো।

আমরা কী কখনো আযানের সঠিক অর্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি? আমাদের পার্থিব জীবন থেকে বিরতি দিয়ে আমাদের স্রষ্টার দিকে মনোনিবেশ করার এটাই সঠিক সময়। ধরুন আপনার মা-বাবা বা আপনার শিক্ষক বা আপনার বস আপনাকে ডাকছেন। আপনি কি তাদের উপেক্ষা করবেন বা আপনি কি তাদের কথা শুনবেন না? তাদের কথা অবশ্যই শুনবেন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিন আপনার স্রষ্টার আহ্বান মুয়াজ্জিনের মাধ্যমে আপনার কাছে আযান আকারে আসছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাস্তবতা ভিন্ন, আমরা আযানকে উপেক্ষা করে আমাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের আযানে মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে কোন পথটি মুসলমানদের জন্য উত্তম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পথ অনুসরণ করা নাকি অজ্ঞ হওয়া? পার্থিব কোন এমন বিষয় আপনাকে এতো ব্যস্ত রেখেছে যে আপনি আপনার প্রভুর ডাক উপেক্ষা করতে পারেন?

আযান শুরু হয় আল্লাহর (আল্লাহর) শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়ে। তারপর আসে শাহাদাহ (বিশ্বাসের স্বীকৃতি), যার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর একত্বের বিধান, শিরককে অস্বীকার করা ও নিশ্চিত করা। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। আর তার পরেই আসে নামাজের আযান ও সাফল্যের জন্য – জান্নাত বোঝানো ও সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে আসা।

প্রতিটি লাইন পুনরাবৃত্তি হয়। এটি সুপারিশ করা হয় যে যখন আযান বলা হচ্ছে, তখন একজনকে মনোযোগ সহকারে শোনা উচিত এবং আযানের পরে নীরবে পুনরাবৃত্তি করা উচিত। মুয়াজ্জিন যখন ‘হায়্যা আলা-স-সালাহ’ এবং ‘হায়্যা আলা-ল-ফালাহ’ বলে তখন বলা উচিত: লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই) ।

আযানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সুর নেই; তবে সঠিকভাবে উচ্চারণের জন্য যে কোনো সুর প্রয়োগ করা যেতে পারে। পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের ন্যায় আযান প্রদান ও এক উন্নতমানের শৈল্পিক নৈপুণ্যে পরিণত হয়েছে। কতিপয় হাম্বলী ‘উলামা আযানে সুরের প্রয়োগ সমর্থন করেন না।

মসজিদে জুমু‘আ ও প্রাত্যহিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান অবশ্য কর্তব্য, তবে গৃহে বা মাঠে নামায আদায় করার সময় আযান দেওয়া উত্তম। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামতের শব্দ উচ্চারণ করা মুস্তাহাব। আযানের পর একটি দোয়া পাঠ করতে হয়। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য বিপদের সময় আযান দেওয়ার বিধান আছে। এর মধ্য দিয়ে বিপদ নিরসনের প্রত্যাশা করা হয়।

আমাদের উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আযান মনোযোগ সহকারে শোনা, আযানের উত্তর দেওয়া ও তারপরই আযানের দোয়া পাঠ করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জানা ও বোঝার তৌফিক দান করুন, আমিন।