সমাপ্তির পথে মেগা প্রকল্পের স্বপ্নের পদ্মা সেতু

শনিবার, মার্চ ১৯, ২০২২

মুন্সীগঞ্জ: চলতি বছর উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা দশটি মেগা প্রকল্পের অন্যতম পদ্মা সেতু। আগামী জুন মাসেই উদ্বোধনের কথা রয়েছে কোটি মানুষের স্বপ্নের এই প্রকল্পটি। মূল সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্ধরিত সময়ে বাকি কাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আবদুল কাদের জানান, মূল সেতুর কাজ অল্প কিছু বাকি আছে। জুন মাসের কোনো একদিন এই সেতুটি খুলে দেওয়া হতে পারে যানবাহন চলাচলের জন্য। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, পদ্মা সেতু শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণ করবে না, সারাদেশের মানুষের ভাগ্যবদলেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। খুলবে অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের দ্বার। এই সেতু ঘিরে ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা বাড়তে কাজ শুরু হয়েছে আশপাশের অঞ্চলগুলোতে।

সরেজমিনে সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেতুর শেষ পর্যায়ের কাজ জোরেশোরে হচ্ছে। উভয় প্রান্তে প্রতিদিন সেতু দেখতে ভিড় করছেন হাজার হাজার মানুষ। তারা সেতুর সঙ্গে সেলফি তুলছেন, পাশাপাশি রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে পদ্মার ইলিশের স্বাদও নিয়ে যাচ্ছেন।

প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেতু নির্মাণে নদীশাসনের কাজ করছে চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। আর সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড। নদীশাসনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জুন মাসের আগেই বাকি কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা রয়েছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের সর্বমোট বাজেটের মধ্যে গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ৮৮.৭৮ শতাংশ। মূল সেতুর কাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ হাজার ১৩৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। যার মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৫৮৯ দশমিক ৬১ কোটি টাকা।

টোলপ্লাজাসহ সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এড়িয়ার কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়ে গেছে। তাছাড়া প্যারাপেট প্রাচীর (রেল ভায়াডাক্ট), মুভমেন্ট জয়েন্ট, পিজি ঢালাই (অ্যাসফাল্ট কংক্রিট) ভায়াডাক্ট, ব্রিজের উপর ওয়াটারপ্রুফ, রোডওয়ে লাইটিং, গ্যাস পাইপ লাইন, ৪০০ কিলোওয়াট টিএল জেনারেটর স্থাপন এসব কাজ প্রায় শেষের পথে।

তবে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে সময়-ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কমিটির সাম্প্রতিক সভায় এর কারণ এবং যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। তবে ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ ও পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথের কাজ চলছে পুরোদমে।

ইতিমধ্যে ৫২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত কাজটি তিনটি সেকশনে ভাগ করা হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া, মাওয়া-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-যশোর। তবে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল চলাচল করবে বলে আশাবাদী রেল কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় মাওয়া থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ইতিমধ্যে ৬৭ শতাংশের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট খরচ ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদীশাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি। বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।

পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ৬.১৫ কিলোমিটার ট্রাস ব্রিজটির ওপরে থাকছে চার লেনের সড়কপথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। সেতুটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ সারাদেশের যোগাযোগ সহজ হবে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘোরার পাশাপাশি বাড়বে কর্মসংস্থান।

পদ্মা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয় ২০০৫ সালে। তবে প্রকল্প নেয়া হয় ২০০৭ সালে। সেই সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। কিন্তু নানা জটিলতায় সাত বছর পর মূল সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে।

পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। এরপর একে একে ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্য ৪১টি স্প্যান বসিয়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার সাথে শরীয়তপুরের জাজিরাকে সংযুক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত সেতুর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিবছর কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করবে, তা নিয়ে ২০০৯ সালে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সেখানে দেখা যায়, ২০২২ সালের যদি পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয়, তাহলে ওই বছর প্রতিদিন সেতু দিয়ে চলাচল করবে প্রায় ২৪ হাজার যানবাহন। যা ২০৫০ সালে দাঁড়াবে প্রায় ৬৭ হাজারের উপরে।