বিভিন্ন দেশ কেন তাদের রাজধানী বদলায়?

রবিবার, জানুয়ারি ৯, ২০২২

অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার আসন প্রতিষ্ঠার নজিরই ইতিহাসে বেশি। কোনো দেশের সবচেয়ে দক্ষ ও মেধাবী পেশাজীবীদের উল্লেখযোগ্য অংশ থাকেন রাজধানীতে। মধ্যযুগের ইউরোপ এবং প্রাচীন ব্যাবিলন, এথেন্সের মতো নগর সভ্যতায় রাজধানী ছিল অস্থায়ী, যা নিয়মিত পরিবর্তন ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
ইন্দোনেশিয়ার নতুন পরিকল্পিত রাজধানীর পুরষ্কারজয়ী নকশা। ছবি: ফোর্বস

মোগল শাসকদের হাতেই ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্বের শুরু। ঐতিহাসিক শরীফ উদ্দিন আহমেদের মতে, ১৬০৮ সালে মোগলরা প্রথম ঢাকায় আসে । ১৬১০ সালে ঢাকার নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর। কিন্তু, এ জনপদের আরও প্রাচীনত্ব নিয়েও দাবি আছে। আর সেটা লুকিয়ে আছে নামকরণের ইতিহাসে। রাজা বল্লাল সেন নির্মিত ঢাকেশ্বরী মন্দির নামের (ঢাকা+ঈশ্বরী) থেকেই “ঢাকা” নামটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

মোগল শাসনের পতন যুগে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় মুর্শিদাবাদে। মোগল সাম্রাজ্যের চরম দুর্বলতার কালে ১৮ শতকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাবই হয়ে ওঠেন প্রকৃত শাসক।

পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী দুইশ বছরের ব্রিটিশ শাসনকালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী ছিল কলকাতা। এরপর ভারতবর্ষ বিভাজনের সময় ১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব বঙ্গের রাজধানী হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্গত হয়।

আরও প্রাচীন যুগে শাসক পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজধানী বদলের অসংখ্য নজির মেলে। ইতিহাসে সহস্র রাজা শত্রুর রাজধানী গুড়িয়ে দিয়েছেন, আবার শূন্য থেকেও গড়ে তুলেছেন।

শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন, আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রয়োজনে যুগে যুগে রাজধানী পরিবর্তন হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। রাজধানী বদলের দক্ষযজ্ঞ একালেও সমান প্রাসঙ্গিক।

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু রাজধানী পরিবর্তনের ঘটনা:

ফারাও আর পিরামিডের দেশ মিশর মানব সভ্যতার আদি এক চারণভূমি। নীল নদের পলল বদ্বীপেই অবস্থিত দেশটির রাজধানী কায়রো। এ এক প্রাচীন নগর, যার অলিগলি সাক্ষী বহু কালের ইতিহাসের। তবু পৃথিবীর কোনো নগরের গৌরবই হয়তো চিরন্তন নয়, কায়রোও তার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরেকবার হারাচ্ছে।

২০১৫ সালে মিশরের স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি কায়রো থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে নতুন রাজধানী নির্মাণের ঘোষণা দেন। নয়া শহরের নামটি বেশ খটমটে- “নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাপিটাল” বা নয়া প্রশাসনিক রাজধানী। নতুন এ রাজধানীর অবকাঠামো নির্মাণে প্রাথমিক খরচ ধরা হয় সাড়ে চার হাজার কোটি ডলার। এই প্রকল্পে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বেশিরভাগই হয় সামরিক বাহিনীর জেনারেল; নাহয় তাদের আত্মীয়-পরিজন। শত শত কোটি ডলার হরিলুঠের মহোৎসব-সহ এ প্রকল্প ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালেই সরকারের সব মন্ত্রণালয়, সচিবালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নয়া রাজধানীতে সরিয়ে এনে এটি চালু করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু, মহামারির কারণে প্রকল্পটি গতি হারায়।

কেবল মিশরই নয়, রাজধানী পরিবর্তন করা দেশের সংখ্যা সাম্প্রতিক ইতিহাসেও কম নয়। যেমন ২০০৬ সালে পালাউ, ২০০৫ সালে বার্মা, ১৯৯১ সালে নাইজেরিয়া এবং ১৯৭০ সালে বেলিজ নতুন রাজধানীতে প্রশাসন ও অর্থনীতির কেন্দ্র সরিয়ে আনে।

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে রাজধানী। জাতীয় গৌরব ও ঐতিহ্যের নানান দিক তুলে ধরার বিষয়টি মাথায় রেখেই রাজধানী নির্বাচন করা হয়। মাথায় রাখতে হয় জনসংখ্যা ঘনত্ব আর ভৌগলিক অবস্থান। দেশীয় সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক শক্তি, বিশ্ব রাজনীতিতে সক্ষমতা রাজধানীর বুকে কমবেশি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে সব দেশ। কোনো কোনো রাজধানী সৃষ্টি করে চমৎকার সব আধুনিক অবকাঠামোয় চমক। সবচেয়ে কার্যকর ও উন্নত অবকাঠামো গড়ে তুলে রাজধানীবাসীর জীবনযাপনকে সাবলীল করার এ চেষ্টা সকল দেশই সাধ্যমতো করে থাকে।

রাজধানীর নানান উপযোগিতা:

অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার আসন প্রতিষ্ঠার নজিরই ইতিহাসে বেশি। কোনো দেশের সবচেয়ে দক্ষ ও মেধাবী পেশাজীবীদের উল্লেখযোগ্য অংশ থাকেন রাজধানীতে। মধ্যযুগের ইউরোপ এবং প্রাচীন ব্যাবিলন, এথেন্সের মতো নগর সভ্যতায় রাজধানী ছিল অস্থায়ী, যা নিয়মিত পরিবর্তন ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। পূর্ব ও পশ্চিম রোমক সম্রাজ্যে শুধু অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্রধর্মেরও প্রাণকেন্দ্র ছিল রোম ও কনস্ট্যান্টিপোল।

ব্রিটিশ প্রকাশনা সংস্থা রাউটলেজ গবেষক তানিয়া কনলি এবং এমিলি মাকাসের একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। লেখকদ্বয়ের মতে, আধুনিক সময়ের মতো রাজধানী প্রথম গড়ে উঠা শুরু করে নেপোলিয়ানিক যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে। এই সময়ে জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছিল। সরকারগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নগরে রাজধানী সরিয়ে এনে বা নতুন রাজধানী নির্মাণের মাধ্যমে এসব জাতীয় ভাবাবেগকে সমর্থন দিয়েছে।”

“কোল্ড ওয়ার মেট্রোপলিস” বইয়ের লেখক ক্যাম্বেল স্কটের মতে, “ওই সময়ে ইউরোপে নগর রাষ্ট্র থেকে আঞ্চলিক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের জোয়ার দেখা দেয়। নগরায়ন দ্রুত হয়ে তা ধীরে ধীরে আধুনিক রাজধানী নগরীর রূপ নিতে থাকে।”

আর. এল. উলফেল ২০০২ সালে প্রথম প্রকাশিত তার ‘নর্থ টু আস্তানা’ বইয়ে লিখেছেন, “সর্বময় জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে রাজধানী শহরের সামরিক ভূমিকা প্রসারিত হয়। শক্তিশালী দুর্গ নগরী থেকে রাজধানী রূপান্তরিত হয় বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কেন্দ্রীয় অবস্থানের প্রতীকে।”

ক্যাম্বেল তার আরেকটি গন্থে তিন ধরনের রাজধানীর সংজ্ঞা দেন। এরমধ্যে তিনি ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্যের বলেছেন- প্যারিস, মাদ্রিদ এবং মেক্সিকো সিটিকে। স্থানান্তরিত রাজধানীর মধ্যে ছিল আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুল। আর নির্মিয়মান বা নতুন গড়া রাজধানীর উদাহরণ দেন নয়াদিল্লি ও ব্রাসিলিয়াকে।

এছাড়া, ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারের আসন এমন রাজধানীর মধ্যে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা, কানাডার অটোয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি।

সরকার ব্যবস্থা দুই বা ততোধিক নগরীতে বিভাজিত থাকলে, একইসাথে রাজধানী হতে পারে তারা সকলেই। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ ও আমস্টারডাম এমন বিভাজিত রাজধানীর উদাহরণ। জাপানের প্রধান দ্বীপ হংশুতে অবস্থিত টোকিও দ্বীপপুঞ্জ রাজধানীর দৃষ্টান্ত।

কিছু দেশের একাধিক রাজধানী থাকে, আর কোনো দেশের কেবল একটি। একাধিক রাজধানী থাকলে একটি শহরে অধিকাংশ সরকারি দপ্তর রেখে, বাকিগুলোকে অন্যগুলির মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়। যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো, কিন্তু জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদ বা কংগ্রেসের সভা অনুষ্ঠিত হয় ভ্যালপারাইসোতে।

নাউরুর মতো কিছু দেশ আনুষ্ঠানিক রাজধানী বলে কোনো বিশেষ শহরকে দাবি করে না। আবার সিঙ্গাপুর ও মোনাকোর মতো ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রে পুরো দেশই হলো রাজধানী।

রাজধানী নির্বাচন হয় কীভাবে:

“ক্যাপিটালস অ্যান্ড দ্য মডার্ন সিটি গ্রন্থে লেখক আন্দ্রে ডম বলেছেন, রাজধানী নগরগুলো ঘিরে বিভিন্ন ধ্যানধারণা জাতীয় পর্যায়ে থাকে। যেমন ” লোকসাহিত্যে সেই শহরের নানান গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়। জাতিরাষ্ট্রের রাজধানী হয় কোনো জাতির সামষ্টিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা অথবা আর্থ-সামাজিক বিপরীত অবস্থার প্রতিচ্ছবি। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজধানী পরিবর্তন কেবল একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।

যেমন ১৮৩৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভের পর প্রাচীন গ্রিসের গৌরবকে তুলে ধরতে এথেন্সকে রাজধানী করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভকারী অনেক দেশ হয় তাদের রাজধানী পরিবর্তন করেছে, নাহলে উপনিবেশিক শাসকদের দেওয়া নাম বদলেছে।

বিষয়টির ব্যাখ্যা করে ‘ক্যাপিটাল রিলোকেশন ইন আফ্রিকা’ গ্রন্থে লেখক ডেবোরা পটস লিখেছেন, “উপনিবেশিক শাসনের সাথে রাজধানীর সম্পৃক্ততা ছিন্ন করতেই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজধানী সরিয়ে নেওয়া বা সাবেক নাম বদলে ফেলা হয়। কারণ রাজধানী একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রতীক।”

ঠিক একারণেই ভারতের স্বাধীনতার কিছুকাল পর পাঞ্জাব ও হরিয়ানার প্রাদেশিক রাজধানী চন্ডিগড় এবং গুজরাটের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে গান্ধীনগর তৈরি করা হয়। জওহরলাল নেহেরু চন্ডিগড়কে ‘ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেন।

এভাবেই উপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্ত জাতির গ্লানিময় অতীত থেকে অপার ভবিষ্যতে আস্থা রাখারও প্রতীক হয় নতুন রাজধানী স্থাপন।

আবার স্বাধীনতা অর্জনের সময় নির্ধারিত নতুন ভূখণ্ডের সীমারেখায় পুরোনো রাজধানী হারিয়ে বতসোয়ানার মতো কয়েকটি দেশকে অন্যত্র রাজধানী স্থাপনে বাধ্য হতে হয়েছে।

ক্যাম্বেল স্কট বলছেন, “যুদ্ধ, বিপ্লব বা শত্রুর আগ্রাসনে রাজধানীর অবস্থান বদলায়।” উদাহরণ হিসেবে তিনি চীনের ঝৌ রাজবংশের কথা উল্লেখ করেন, বিদেশি শত্রুর হামলার মুখে তাদের খৃষ্টপূর্ব ৭৭১ শতকে হাও নগর থেকে লোইয়াংয়ে রাজধানী সরিয়ে নিতে হয়েছিল।

তবে আধুনিক যুগে জনসংখ্যার অত্যধিক চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তুলনামূলক বেশি সম্পদ ব্যবহারের জন্য পাওয়া যাবে, এমন এলাকাতেই রাজধানী স্থাপন করা হচ্ছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস