খেজুরের রস সংগ্রহ করলে গাছের কতটা ক্ষতি?

শনিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২২

ময়মনসিংহ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেজুর গাছ থেকে সাধারণত অতিরিক্ত রস খাওয়ার জন্য নামানো হয়। সে হিসাবে রস সংগ্রহের ফলে খেজুরের গুণগত মান কমবে না। তবে গাছ কাটার ফলে ফলন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।

শীতকাল এলেই গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছ থেকে শুরু হয় রস সংগ্রহ। অনেকেরই প্রিয় এই খেজুরের রস। আবার এই রস দিয়ে তৈরি পাটালি গুড় শীতের পিঠা-পায়েসের অবিচ্ছেদ্য উপকরণ।

খেজুর গাছে রস কেন তৈরি হয়, আর সেই রস সংগ্রহ করলে গাছের ‘স্বাস্থ্যে’ কী প্রভাব পড়ে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের পাশাপাশি গরমকালেও খেজুর গাছে রস তৈরি হয়, তবে পরিমাণে খুবই কম। শীতকালে গাছে অতিরিক্ত রস হয় বলেই সেটি সংগ্রহ করা যায়। এতে গাছের কিছুটা ক্ষতি হলেও দেশি প্রজাতির খেজুর গাছের ফল তেমন জনপ্রিয় নয় বলে রস সংগ্রহই লাভজনক।

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য অনুযায়ী, খেজুর গাছ একবীজপত্রী, এক লিঙ্গ বৃক্ষ। অর্থাৎ পুরুষ ও মেয়ে গাছ আলাদা। মেয়ে গাছে ফল ধরে। শাখাহীন গাছ চার থেকে ১৫ মিটার লম্বা হয়।

খেজুরের রস নামালে গাছের কতটা ক্ষতি?

দেশি খেজুর গাছ দ্রুতবর্ধনশীল, শাখাবিহীন এক কাণ্ডবিশিষ্ট। দেশি খেজুর গাছের গোড়া মোটা ও স্তূপের মতো শিকড় থাকে। গাছের মাথায় পত্রগুচ্ছ নারিকেল-সুপারি গাছের মতো। চৈত্র মাসে গাছের কাঁদিতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল ফোটে। মেয়ে গাছে ফল হয় গ্রীষ্মকালে। দেশি পাকা খেজুরের রঙ লালচে বাদামি থেকে খয়েরি হয়।

আরবের খেজুরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া হলেও দেশি খেজুর গাছের ফলের কদর বলতে গেলে একেবারেই নেই। তবে বাংলাদেশে খেজুর গাছ সমাদৃত মূলত এর রসের কারণে।

দেশি খেজুর গাছের বয়স চার বছর পার হলেই রস সংগ্রহ শুরু হয়। শীতের সময়ে গাছ বিশেষ পদ্ধতিতে চেঁছে তা থেকে রস নামানো হয়। এ পেশায় নিয়োজিত বলা হয় ‘গাছি’।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত সপ্তাহে তিন দিন গাছ কাটা হয়। এর মধ্যে সপ্তাহের প্রথমে যে রস নামানো হয় সেটিই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। সপ্তাহের প্রথম দিন নামানো রসকে ‘জিরান কাটের রস’ বলে, দ্বিতীয় দিনেরটিকে বলে ‘দো কাটের রস’ আর তৃতীয় দিনের রসকে বলে ‘ঝরা রস’। প্রথদিনের রস থেকে ভালো মানের গুড় ও পাটালি তৈরি হয়। ঝরা রস থেকে হয় ‘তোয়াক গুড়’ ও ‘ঝোলা গুড়’।

খেজুরের রস নামালে গাছের কতটা ক্ষতি?

গবেষকরা বলছেন, সালোক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খেজুর গাছে রস তৈরি হয়। এই সালোক সংশ্লেষণে সূর্যের আলো ব্যবহার করে গাছ কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে। কার্বোহাইড্রেট চিনির ফর্মে তৈরি হয় বলে রস মিষ্টি লাগে। গরমকালেও একই প্রক্রিয়ায় কিছুটা রস উৎপন্ন হয়। তবে সেটি শীতকালের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম৷ ফলে গ্রীষ্মে উৎপন্ন রসের পুরোটাই গাছের প্রয়োজনেই ব্যয় হয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘শীতকালে খেজুর গাছ রসে টইটম্বুর থাকে। গাছ নিজের প্রয়োজনে এই রস তৈরি করে। চেঁছে এই রস বের না করলে গাছের পাতা দ্রুত বৃদ্ধি পেত। পাতা সতেজ, খেজুরের আকার বৃদ্ধিসহ গাছের আকার আরও বৃদ্ধি পেতো।’

গাছ থেকে রস বের করলে খেজুরের গুণগত মান কিংবা ফলন কমে যায় কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশীয় প্রজাতির খেজুরের গুণগত মান ভালো না। এজন্য খেজুরের চারাও কেউ রোপন করেন না। খেজুরের বীজ থেকে বাড়ির উঠোনে, খেতের আইলে বা ঝোপের মধ্যে আপনা আপনি চারা উৎপন্ন হয়।

‘সাধারণত এসব গাছ থেকে অতিরিক্ত রস খাওয়ার জন্য নামানো হয়। সে হিসাবে খেজুরের গুণগত মান কমবে না। তবে গাছ কাটার ফলে ফলন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।’

খেজুরের রস নামালে গাছের কতটা ক্ষতি?

সৌদি আরবের মতো মরু অঞ্চলের দেশে খেজুরের ফল উৎপাদনে বেশি জোর দেয়া হয়। এজন্য সেসব দেশে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয় না বলে জানান অধ্যাপক আব্দুল কাদের।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘দেশি খেজুরের ফলের শাঁস পাতলা, বিচি বড়, পাকা ফল সংরক্ষণ করাও কঠিন। এরপরেও পাকা ফলের সুমিষ্ট গন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ অনেককে আকৃষ্ট করে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণত চার বছর বয়সের পর থেকে খেজুর গাছের রস আহরণ করা যায়। তখন গাছে ১২-১৫টি পাতা থাকে। সপ্তাহে তিন দিন গাছ কাটা হয়। বিরতি দিয়ে সপ্তাহের প্রথমে যে রস নামানো হয় সেটাই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের। দেশীয় খেজুর ফলের মান ভালো না বলে গাছের রস বের করে খাওয়াই উত্তম।’

চট্টগ্রাম কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সমীর কান্তি নাথ বলেন, ‘খেজুর গাছের মতো তাল গাছ থেকেও রস সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশে না হলেও কয়েকটি দেশে নারকেল গাছ থেকেও রস সংগ্রহের নজির রয়েছে। এ ধরনের গাছ মাটি থেকে পানি আহরণ করে পাতায় সালোক সংশ্লেষণের মাধ্যমে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ উৎপাদন করে। এরপর সেগুলো সুক্রোজ আকারে কাণ্ডের বিভিন্ন অংশে পরিবাহিত হয়।

‘আমরা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ আকারে জমা থাকা তরল রস আকারে সংগ্রহ করি। এতে গাছের কিছুটা ক্ষতি তো অবশ্যই হয়।’

খেজুরের রস নামালে গাছের কতটা ক্ষতি?

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. মতিউজ্জামান বলেন, ‘বয়স্ক গাছে রস খুব কম হয়। তবে শীত যত বাড়ে, সমান্তরালে কম বয়স্ক গাছে রস বাড়ে। গাছের উপরিভাগের নরম অংশে চাঁছ দিয়ে রস নামানো হয়। একবার গাছে চাঁছ দিলে দুই থেকে তিন দিন রস পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় ছয় হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এগুলো থেকে নিয়মিত রস নামানো হচ্ছে। শীতকালে অনেকে শুধু রস বিক্রি করেই সংসারের ভরণপোষণ করছেন। খেজুরের গাছ থেকে প্রচুর রস কিংবা খেজুর উৎপাদনের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কেউ চাষাবাদ করলে সব ধরনের পরামর্শ দেয়া হবে।’