শরীরে যন্ত্রপাতি স্থাপনের যেসব গল্প সায়েন্স ফিকশনে থাকে, খুব শিগগির তা বাস্তবে রূপ নেবে

বুধবার, জানুয়ারি ৫, ২০২২

চিকিৎসা বিজ্ঞান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাইক্রোচিপ ইমপ্ল্যান্টকে গ্রহণ করেছে। রোগীর শরীরে এটি লাগানো হয় এক ধরনের ডিজিটাল ট্যাগ হিসেবে। যেমন কেউ যদি পঙ্গু হন, এবং তাকে কৃত্রিম পা ব্যবহার করতে হয়- সেক্ষেত্রে ওই যান্ত্রিক (প্রস্থেটিক) পা- কে নিয়ন্ত্রণ করে এমন মাইক্রোচিপ।
এক্স-রে চিত্রে মানবদেহে স্থাপিত একটি স্থায়ী পেসমেকার ইমপ্ল্যান্ট দেখা যাচ্ছে। ছবি: আইস্টক/ ওয়াশিংটন টাইমস

শরীরে যন্ত্রস্থাপন নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য ‘মেডিকেল ইমপ্ল্যান্ট’ স্থাপন চলে আসছে কয়েক দশক ধরেই। মানবদেহে প্রাণদায়ী পেসমেকার, ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট বা কানের হিয়ারিং এইড এবং হৃদযন্ত্রে সহায়ক কার্ডিয়াক ডিফিব্রিলেটর স্থাপন চিকিৎসা বিজ্ঞানকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

সময়ের সাথে সাথে উন্নতি হচ্ছে এসব প্রযুক্তির। যাদের শরীরে এসব যন্ত্র রয়েছে তারা মুঠোফোন, স্মার্টওয়াচ বা পরিধেয় অন্য ডিভাইসের মনিটরে চোখ রেখেই জানতে পারেন হার্টরেট-সহ অন্যান্য তথ্য।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখন এসব প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করছেন। চাইছেন ভোক্তাদের ব্যবহৃত মনিটরিং ব্যবস্থা শরীরের ভেতরেই স্থাপন করতে।

নামে ভয়াবহ! (ডেঞ্জারাস থিংস) হলেও আমাল গ্রাফস্ট্রার কোম্পানি কাজ করে মানব শরীরে চুম্বক ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত ইমপ্ল্যান্ট স্থাপনে। ২০১৩ সালে এ কোম্পানি প্রতিষ্ঠাকারী আমাল বলেন, “যতদিন যাচ্ছে আমরা শরীরের সাথে যন্ত্রের বাইরের পার্থক্য অদৃশ্য হতে দেখছি। আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিই দেয় সে ইঙ্গিত। অবশ্যই আরো উন্নত যন্ত্রের সাথে শরীরের মেলবন্ধন ঘটবে। সভ্যতার এগিয়ে চলার কারণে এ পরিবর্তন একেবারেই নিশ্চিত”।

কিছু ক্ষেত্রে সেই মেলবন্ধন এরমধ্যেই ঘটছে। চিকিৎসা বিজ্ঞান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাইক্রোচিপ ইমপ্ল্যান্টকে গ্রহণ করেছে। কোনো রোগীর শরীরে এটি লাগানো হয় এক ধরনের ডিজিটাল ট্যাগ হিসেবে। যেমন কেউ যদি পঙ্গু হন, এবং তাকে কৃত্রিম পা ব্যবহার করতে হয়- সেক্ষেত্রে ওই যান্ত্রিক (প্রস্থেটিক) পা- কে নিয়ন্ত্রণ করে এমন মাইক্রোচিপ।

পারকিনসন ডিজিস নামক মগজের অসুখে আক্রান্তদের চলাফেরায় বেশ সমস্যা হয়। এক্সেলোমিটারের মতো প্রযুক্তি তাদের নিউরনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সেসব তথ্য নিউরোলজিস্টদের জানাচ্ছে। ফলে রোগীর সাথে পরবর্তী সাক্ষাতের আগেই মাঝখানের সময়টায় তার শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে পারছেন তারা। সেই মাফিক ব্যবস্থাপত্রে দিতে পারছেন ওষুধের নির্দিষ্ট ডোজ।

আরো সূক্ষ্ম নতুন মানবযন্ত্র উন্নয়নে গবেষণাও চলছে পুরোদমে। ইলিনয় ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এমন কিছু অতি-ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক সেন্সর তৈরি করেছেন যা অস্থায়ী ‘ট্যাটু’র মতো চামড়ার নিচে স্থাপন করা যাবে। মগজের তরঙ্গ মনিটর করে এটি ঠেকাবে সিজার বা খিঁচুনি। তাছাড়া, চিকিৎসকরাও এর পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন। এভাবে খিঁচুনির সমস্যায় ভোগা রোগীর নানান রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন অনেকটাই দূর হবে। তাছাড়া, রোগী নিজ শরীরেই বহন করবেন তার মেডিকেল রেকর্ড।

নিকট ভবিষ্যতে চিকিৎসা পদ্ধতি অনেকটাই শরীরে স্থাপিত যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হবে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

ইউনিভার্সিটি অব পিসা’র ইলেক্ট্রনিক্সের সহকারী অধ্যাপক জিসেপে বারিল্লারো বলেন, “ল্যাবটেরিতে রোগীর শারীরিক নমুনা পরীক্ষার যুগ এখনো ফুরায়নি। বিশ্লেষক ল্যাবগুলি তাদের কাজ আগামীতেও চালিয়ে যাবে। তবে পরীক্ষার কাজটা ধীরে ধীরে চিপের মাধ্যমে হতে থাকবে। ভবিষ্যতের চিপগুলো নিজেরাই হবে একেকটি পরীক্ষাগার। সেসব তথ্য জেনে নেওয়ার পর চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রয়োজন বোধ করলে রোগীর প্রচলিত শারীরিক পরীক্ষাও করে দেখবেন”।

জিসেপে বারিল্লারো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বেশ আশাবাদী। জৈবিক উপাদানে তৈরি যন্ত্র নিয়ে সম্প্রতি তিনি আরেকজন গবেষকের সাথে একটি বই লিখেছেন। এ ধরনের জৈবিক উপাদানে তৈরি ইমপ্ল্যান্ট রোগ সারানোর কাজ ফুরালে নিজে থেকেই ক্ষয় হয়ে রোগীর শরীরে মিশে যাবে।

বারিল্লারো জানান, জৈবিক উপাদান তৈরির প্রযুক্তি এখনও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য বা পরিণত হয়ে ওঠেনি। তাই চিকিৎসার সকল কাজে ব্যবহারের জন্য তা বাণিজ্যিকভাবে সহজলভ্যও নয়। তবে সময়ের সাথে সাথে সে বাধা কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে মনে করেন তিনি।

বাস্তবতার দাবিও মানবদেহে যন্ত্র স্থাপনকে উৎসাহিত করছে। যেমন উন্নত দেশে হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ বেড়ে চলায়; রোগীরা কম সময় সেখানে থাকছেন। ফলে চিকিৎসক ও গবেষকরা রোগ পর্যবেক্ষণে আগের চেয়ে কম সময় পাচ্ছেন। তাই তারা রোগীর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখতে নিচ্ছেন প্রযুক্তির আশ্রয়। যন্ত্রের সাহায্যে রোগীরাও বুঝেশুনে চলতে পারছেন।

যেমন ডায়াবেটিক রোগীদের গ্লুকোজ মাপার ইমপ্ল্যান্ট মোবাইল অ্যাপে তথ্য পাঠাচ্ছে। ২০১৮ সালে এ ইমপ্ল্যান্টের ব্যবহার অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)। এভারসেন্স কোম্পানির তৈরি এ যন্ত্র ৯০ দিন পর্যন্ত সচল থাকে। বর্তমানে কোম্পানিটি সারাবছর সচল থাকবে এমন একটি ইমপ্ল্যান্ট তৈরির চেষ্টা করছে।

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র একটি মহামারি ব্যাধি হয়ে পৃথিবীকে গ্রাস করেছে দীর্ঘসময় ধরে। নীরব এ মহামারি জনস্বাস্থ্যের জন্য আজ এক বড় হুমকি। রোগটির চিকিৎসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রকম তৎপরতা চলছে। ইমপ্ল্যান্ট প্রযুক্তি হয়েছে সে চেষ্টারই অংশ।

এভারসেন্সের ইমপ্ল্যান্টটি ব্যবহার করছেন এমন ১২৫ জন রোগীর ক্লিনিক্যাল গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে এফডিএ জানিয়েছে, মাত্র ১ শতাংশ ক্ষেত্রে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে রোগীদের বিরূপ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কোম্পানিটির একজন মুখপাত্র মিরাসল পানলিলিও বলেন, অনেক ব্যবহারকারী চাইলে খুলে রাখা যাবে এমন ডিভাইসের চাহিদার কথা জানিয়েছেন। সব সময় দেহের ভেতর একটি যন্ত্র নিয়ে চলাফেরা অনেকেই পছন্দ করেন না। এই বৈশিষ্ট্য আমরা ভবিষ্যৎ পণ্যে রাখার চেষ্টা করছি।

নতুন প্রজন্মের ইমপ্ল্যান্ট গবেষণায় একটি বড় বাধা স্বেচ্ছাসেবী সংখ্যা। পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য হলেও যন্ত্র শরীরের ভেতর লাগিয়ে রাখতে চান না অনেকেই- জানান মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হুবার্ট এইচ লিম।

তবে লিম জানান, শখের বেশে শরীরে নানান রকম যান্ত্রিক উপকরণ লাগানো মানুষের সংখ্যা পশ্চিমা বিশ্বে নেহাত কম নয়। যেমন শখের বশে অনেকেই হাতের তালুর চামরার নিচে লাগিয়েছেন দামি গাড়ির রিমোট-কি। কিন্তু, এসব ডিভাইস শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি নিত্যদিনের জীবনেও আনতে পারে বিড়ম্বনা। যেমন- স্বাস্থ্য পরীক্ষার এমআরআই স্ক্যান বা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশীর সময় এসব ডিভাইস ব্যবহারকারীরা হয়রানির শিকার হন। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনুমোদিত নয়, এমন ইমপ্ল্যান্ট না ব্যবহারেরই পরামর্শ দেন।

এবিষয়ে তার মন্তব্য, “খুব গুরুতর কোনো শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রে আমরা নতুন ও অপরীক্ষিত প্রযুক্তি সীমিতভাবে ব্যবহার করে দেখি। কিন্তু, নিরাপদ ও বৈধভাবে শরীরে যন্ত্র স্থাপনের উপায়ও আছে। এজন্য আমাদের প্রযুক্তির নব-সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। পরীক্ষিত-প্রমাণিত যন্ত্রকে গ্রহণ করার মধ্যে ভয়ের কিছু নেই। এব্যাপারে অনেকের ভয় থাকলেও, আমি নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি সেটা অমূলক। কোমর ও হাড়ের সমস্যায় ভোগা অনেক মানুষ ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করে চলাফেরা করতে পারছেন, এটা তাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এ সফলতাই আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। আর সব মানুষ যখন সুফল বুঝবে, তখন নিজে থেকেই এতে উৎসাহ দেখাবে।”

সূত্র: দ্য ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল