মন খারাপ? জানেন কি এটাও উপকারী!

বুধবার, জানুয়ারি ৫, ২০২২

গবেষকদের মতে, নিত্যদিনের সামান্য খারাপ লাগার অনুভূতিকে মনের আদালতে বিচার না করে মেনে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য।

জীবনসঙ্গী ভুলে গেলেন বিবাহবার্ষিকীর দিন, জন্মদিনে ‘উইশ’ করেনি প্রাণের বন্ধু? ছোটখাট এসব কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের মন খারাপ হতেই পারে। কিন্তু তা চেপে না রাখাই ভালো। অথচ সেটাই আমরা করছি প্রতিনিয়ত।

আমরা ছোটখাট বিষয়ে মন ভারি না করার চেষ্টাতে ব্যস্ত। ভাবি তা হবে নিজের দুর্বলতা বা ক্ষুদ্রতার বহিঃপ্রকাশ। অভিমান হলেও চেপে যাই সেকারণে। এই যে নিজের সাথেই লুকোচুরি খেলা, তাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘মুড শেমিং’ বা মনের ভাবকে অবদমন।

তারা বলছেন, এমনটা করে আমরা কতটা সহনশীল- তা দেখাতে চাই। সহনশীলতাকেই মানসিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখাই। ছোটখাটো ব্যাপার ভুলতে মনোযোগ দেই অন্যত্র। কিন্তু, সেই খারাপ লাগা আমাদের অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে এবং সেখানে ভিন্ন অনুভূতির জন্ম দেয়।

যেমন এতে করে অন্যের সুখের প্রতি মনে পরশ্রীকাতরতা বা হিংসার জন্ম নিতে পারে। তাছাড়া, ছোটখাটো ব্যাপার ভুলে থাকা নিজেকে এক প্রকার শাস্তি দেওয়ার শামিল। স্বেচ্ছায় নেওয়া এ শাস্তিও মুড শেমিংয়ের পর্যায়ে পড়ে।

স্বাভাবিকভাবে জীবনের শুধু ইতিবাচক দিক নিয়ে ব্যস্ত থাকাকে মানসিক শক্তি ও সাহসের উদাহরণ হিসেবে ধরা হলেও, খুব বেশি সময় এমনটা করার প্রভাব হয় মারাত্মক। এতে গভীর বিষাদ, ঘৃণা এবং উদ্বেগ জমে মনের গহীনে। সাম্প্রতিক কিছু মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, জীবনের ছোট ছোট দুঃখ উদযাপনের আছে ইতিবাচক দিক। বরং চেপে রাখাতেই ক্ষতি।

গবেষকদের মতে, নিত্যদিনের সামান্য খারাপ লাগার অনুভূতিকে মনের আদালতে বিচার না করে মেনে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য।

তবে তার মানে এই নয়, আমরা মারাত্মক নেতিবাচক অনুভূতির ক্ষেত্রেও একইরকম করব। যদি আমরা আগে থেকেই কোনো গভীর বিষাদ ও উদ্বেগের ভুগি, তাহলে ছোটখাট ব্যাপারে মন খারাপ করা প্রচণ্ড ক্ষতিকর হতে পারে। এসব ব্যাপারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা এবং নেতিবাচক চিন্তা এড়িয়ে চলাই সেরা উপায়।

বরং জীবনের সামান্য সব দুঃখ, পাওয়া না পাওয়ার চিরকালীন সমীকরণই এখানে মেনে নিতে বলা হয়েছে- যা আমরা প্রায়শই এড়িয়ে চলি।

ইতালীয় দার্শনিক ইলারা গ্যাসপারি সম্প্রতি তার একটি বই ‘ভিটা সিগরেটা ডেলে ইমোজানি’ বা ‘অনুভূতির গোপন জীবন’ নামক বইয়ে এ সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি লিখেছেন, সামান্য খারাপ লাগার অনুভূতিকে চাপা দেওয়ার সহজাত অভ্যাস আমাদের খারাপ লাগাকে বাড়ায় বৈ কমায় না। তার সাথে যোগ করে ‘লজ্জা’ বা ‘ভীতি’। ফলে যে তীব্র অনুভূতি হয় তা আমরা যে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করছি তার থেকেও অনেক শক্তিশালী ও উত্তেজক হয়ে দাঁড়ায়। যা মানসিক স্বাস্থ্যে চাপ সৃষ্টি করে।

ইলারা বলেছেন, “আবেগী হওয়া মানেই অস্থির বা ভারসাম্যহীন হওয়া নয়, বিষয়টি আমি অনেক দেরিতে হলেও বুঝেছি। বরং পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়া ও বেঁচে থাকারই অংশ এটি, যা আমাদের জীবনের ছোট ছোট দিক সম্পর্কে উপলদ্ধির জন্ম দেয়।”

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বইটি লিখেছেন এ দার্শনিক। তবে বিজ্ঞান তার চিন্তাকে সমর্থন করছে। সিরিজ কিছু গবেষণাও বলছে, মনোজগতের জন্য খুবই ক্ষতিকর- মুড শেমিং।

এমন একটি গবেষণা পদ্ধতির উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রায় এক হাজার মানুষের মধ্যে এটি পরিচালিত হয়। তাদের উদ্দেশ্যে রাখা হয় তিনটি বক্তব্য (মন খারাপের চিন্তাধারা সম্পর্কিত)। কখনো না/ কালেভদ্রে সত্যি- এমন উত্তরের ভিত্তিতে ১-৭ নাম্বার অনুযায়ী অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যগুলোর রেটিং করতে বলা হয়। অর্থাৎ, এসব বিষয় তাদের ক্ষেত্রে কতোটা সত্যি তাই জানাবে রেটিংয়ে দেওয়া নম্বর হার।

বক্তব্যগুলো ছিল-

নিজেই নিজেকে বোঝাই- আমার এভাবে মন খারাপ করার কোনো মানে হয় না
অযৌক্তিকভাবে আবেগী হওয়া পড়লে নিজেকেই তিরস্কার করি
আমি মনে করি, কিছু ব্যাপারে আবেগী হওয়াটা ভালো নয় বা যুক্তিসঙ্গতও নয়, তাই এসব নিয়ে না ভাবাই উচিত।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের গবেষক আইরিস মস। তিনি দেখেন, যারা বক্তব্যগুলোকে বেশি রেটিং দিয়েছেন তাদের মধ্যে গভীর বিষাদ ও উদ্বেগে ভোগার লক্ষণও ছিল ততোটাই সুস্পষ্ট। অন্যদিকে যারা নিত্যদিনের ছোটখাট দুঃখকে ‘অনভিপ্রেত’ বা ‘মন্দ’ এমন বিশেষণ না দিয়ে মেনে নিতে পারছেন- তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো।

ভালো ও মন্দ দিক অনুধাবন:

জীবনে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আমরা যা ভাবি প্রায়শই তা বাস্তবে রূপ নেয়। আশঙ্কাও তেমনিভাবে সত্যি হয়ে উঠতে পারে। ভয় থেকেই শারীরিক ব্যথার অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা যেমন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে দেখা যায়, মনের কষ্টও আমাদের মানসিক প্রতিক্রিয়াকে একইভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

কষ্ট তখনই হয় যখন প্রত্যাশা পূরণ হয় না। সেই বোধটি সুখকর নয় অবশ্যই। তবে এই খারাপ লাগা থেকে আপনি অন্যের সাথে সম্পর্কে কোথায় ভুল হয়েছে সে শিক্ষাটি নিতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন মনোবিজ্ঞান লেখক ডেভিড রবসন।

তিনি বলছেন, কীভাবে আমরা সেই খারাপ লাগাটিকে গ্রহণ করব- তার ওপর নির্ভর করছে কষ্টের অনুভূতি কতোটা লাঘব হবে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে আমাদের স্বাস্থ্যে। আমরা যদি মন খারাপের ইতিবাচক অর্থ নিয়ে ভাবি ও সম্ভাব্য সমাধানের চিন্তা করি তাহলে এটি মোকাবিলায় মস্তিস্ক ও শরীরের প্রতিক্রিয়াতেও উন্নতি হতে থাকবে।

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপম্যান্টের এক গবেষণা এই বিশ্লেষণকে সমর্থন করছে। তাদের একটি মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের স্নায়বিক দুর্বলতা (নার্ভাসনেস), রাগ এবং বঞ্চিত মনে হওয়ার মতো নিজস্ব বিভিন্ন অনুভূতিকে রেটিং দিতে বলা হয়।

তাদের কাছে এসব অনুভূতির যথার্থতা, অর্থ আর তাৎপর্যও জানতে চান গবেষকরা। অংশগ্রহণকারীরা কোনো বিশেষ মানসিক অবস্থাকে কীভাবে নেন, তাই তুলে ধরে এই তিনটি মাত্রার ব্যাপারে তাদের মূল্যায়ন।

এই পরীক্ষায় যেসব অংশগ্রহণকারী তাদের মন খারাপের মধ্যেও ইতিবাচক দিক দেখেছেন- তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের মানদণ্ডে ভালো করতে দেখা গেছে।

তাদের মধ্যে বিভিন্ন বক্ষব্যাধী এবং ডায়াবেটিসের মতো উদ্বেগ সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল বেশ কম। টানা তিন সপ্তাহের এই গবেষণার ফলাফল ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। মন খারাপ হওয়া মেনে নিয়েও যে জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানো যায়- তারই ইঙ্গিত দেয় বিজ্ঞানের এ অনুসন্ধান।

সূত্র: বিবিসি ফিউচার