জন্ম হোক যথা তথা, গোত্র হোক মানবতা

শনিবার, আগস্ট ২৪, ২০১৯

বিনোদন ডেস্ক : শিবপ্রসাদ-নন্দিতা মানেই ব্যকরণের বাইরে। এই পরিচালক জুটিই বারবার সামনে এনেছেন নতুন নতুন সমীকরণ। তাদের ছবি মানেই পারিবারিক ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে থাকবে সামাজিক বিষয়। এবারেও সেই চমক অব্যাহত রেখেই তৈরি করছেন ‘গোত্র’।

ছবিতে মুক্তিদেবীর চরিত্রে অনসূয়া মজুমদার। এতে আরো অভিনয় করেছেন, নাইজেল আকারা, মানালি মনীষা দে, খরাজ মুখোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায়, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, বাদশা মৈত্র, অম্বরীশ ভট্টাচার্য বিশ্বনাথ বসু, দেবলীনা কুমার।

উইন্ডোজ প্রোডাকশন প্রযোজিত ছবিটি গতকাল ২৩ আগস্ট প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। ছবির গল্প মা-ছেলের এরকম টুকরো টুকরো অন্তরঙ্গ দৃশ্য জুড়েই। পুরাণে যে যশোদা আর কৃষ্ণের কাহিনি আছে তারই একুশের সংস্করণ এই ছবি। যেখানে গোবিন্দধামের মুক্তি দেবীকে তার পেটের ছেলে বাইরে থাকার সুবাদে রেখে যান এক কেয়ারটেকারের জিম্মায়।

সেই কেয়ারটেকার তারেক আলি। ৯ বছরের জেল খাটা আসামী। দুটো খুনের মামলাসহ একাধিক অপরাধের অভিযোগ তার মাথায়। লম্বা লম্বা চুল, বিশাল চেহারার এই কেয়ারটেকারকে প্রথম দেখার পর যদিও মুক্তি দেবীর মনে হয়েছিল ‘হুলো বেড়াল’! তারেকের কাছেও মুক্তি দেবী পয়লা দর্শনেই মা নন। তবে কোথাও যেন সেই সুর রিনরিন করে তার মনে বেজেছিল।

এছাড়াও গোবিন্দধামে আছে মুক্তি দেবীর ডান হাত ঝুমা পাল। গোপালের নিত্যপুজোর পুরোহিত। একমাত্র ছেলে অণির্বাণের পুলিশ অফিসার বন্ধু, মুক্তি দেবীর ‘বয়ফ্রেন্ড’ সজল জ্যেঠু। আর শকুন বাপি। যে প্রমোটারির জন্য দরকারে মুক্তি দেবীকে মেরে তার গোবিন্দধামের দখল নিতে পারে। আছে তারেক-ঝুমার দুষ্টু-মিষ্টি প্রেম। মা-ছেলে-হবু বউমার ওড়িশা ভ্রমণ।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে সর্বধর্মসমন্বয়ের বার্তা। আরেক হিন্দুর উৎসবে মুসলিম তারেক আলির ভোগ পরিবশন নিয়ে শকুন বাপির প্রতিবাদের বিরুদ্ধে পালিত ছেলের হয়ে আগ্রা শহরের হিন্দু-মুসলিমের একসঙ্গে জন্মাষ্টমী পালনের উদাহরণ টেনে কোমর বেঁধে মুক্তি দেবীর আন্দোলন। এবং শেষে পালিত ছেলেকে মায়ের গোত্র দান….. নাহ!, আর বললে আপনারা হলে গিয়ে কী দেখবেন!

এখানে আধুনিক যশোদা মা অনসূয়া মজুমদার। যিনি চোখে হারান নিজের ছেলেকে। ছেলেকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে বারবারে কেয়ারটেকার তাড়িয়েছেন। শেষপর্যন্ত বাঁধা পড়েছেন তারেক আলির কাছে। যে সারাক্ষণ তার মৃত মায়ের স্মৃতি বুকে আগলে মুক্তি দেবীর মধ্যেই হারানো মাকে খুঁজে পায়। গরমের ছুটিতে আসার কথা দিয়েও যখন ছেলে আসতে পারে না, তখন মুক্তি দেবীর ছলছল চোখ দেখে তার বুকে মোচড় পড়ে। আবেগে বলে ওঠে, আমি তোমায় মা বলে ডাকতে পারি? এবং শেষপর্যন্ত মুক্তি দেবীও স্বীকার করে নেন, বরাবর ছেলের শখ। এই বয়সে এসে ভগবান আবার একটা ছেলে জুটিয়ে দেবেন, কে জানত! একই প্রোডাকশনের ‘মুখার্জিদা-র বউ’-এ শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয়ের পর অনুসূয়া এই ছবিতে ফের কাঁপিয়ে দিয়েছেন।

ছবির শেষে তিনি নিজে স্বীকার করেছেন, ‘দেখতে দেখতে চোখে জল এসে গেছে’। ছবিকে প্রাণবন্ত করার দায়িত্ব ছিল মানালির ওপর। সেটা ২০০ শতাংশ পালন করেছেন তিনি। তিনি আর নাইজেল যেন সত্যিই বাংলার অমিতাভ-জয়া! শকুন বাপির চরিত্রে কমিক আর ভিলেনের যুগলবন্দি কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছেন খরাজ। বাকিরা যথাযথ।

দুটি পেপি সং-এ দুরন্ত বিশ্বনাথ বসু আর দেবলীনা কুমার। বাকি নাইজেল আকারা। সবাই যেখানে বাঘা অভিনেতা এবং নিয়মিত অভিনয় করেন সেখানে নাইজেল নিয়মিত লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের মধ্যে না থেকেও অ-সাধারণ। টাইমিং বুঝে জেশ্চার-পশ্চার পালটানো, চোখের জল, বিরক্তি, রাগ, হুমকি, মাকে চোখে হারানো আর চাপা প্রেমে উদ্বেল এক প্রেমিক—সব মিলিয়ে সম্পূর্ণ অভিনেতা। নাইজেল নন্দিতা-শিবপ্রসাদের প্রথম ছবি ‘মুক্তোধারা’-তেও বাজিমাত করেছিলেন। এখানে যেন আরও ধারালো।

বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপে, গানে, দৃশ্যায়নে, সমাজের প্রতি বার্তা ছড়িয়ে ফের উইন্ডোজ প্রমাণ করল, বছরে দুটো ছবি করলেও, কোয়ালিটির সঙ্গে তারা মোটেই কম্প্রোমাইজ করে না। শেষ কথা, ভাগ্যিস শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে মা জয়া মুখোপাধ্যায় ছিলেন! তাই তো তিনি সর্বজায়া হয়ে নিজের জীবন কাহিনি দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, অ-খ্যাতরাও অনুসরণযোগ্য। তাদের নিয়েও ছবি বানানো যেতে পারে। সত্যিই, মা পাশে থাকলে কী না হয়!। সূত্র: এনডিটিভি