শ্রীলংকার রাজনীতি নিয়ে চীন-ভারত ছায়াযুদ্ধ চরমে

রবিবার, অক্টোবর ২৮, ২০১৮

ঢাকা: রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়েছে শ্রীলংকা। প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের ক্ষমতার লড়াইয়ে ভেঙে গেছে তিন বছর আগে সরকার গঠনকারী ইউনিটি জোট। যার বিরুদ্ধে ইউনিটি হয়েছিল, সেই মাহিন্দা রাজাপাকসে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রীর পদে। সাবেক এ প্রেসিডেন্টের প্রত্যাবর্তনে শ্রীলংকার রাজনীতির পাশাপাশি পালাবদল ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্যেও। নতুন সমীকরণে শ্রীলংকা ক্রমে ভারত থেকে সরে চীনের ঘনিষ্ঠ হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। খবর ব্লুমবার্গ ও এএফপি।

শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শ্রীলংকার রাজনীতিতে নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করে মাহিন্দা রাজাপাকসেকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। এতে করে শ্রীলংকার রাজনীতি নিয়ে ভারতের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধে এক ধাপ এগিয়ে গেছে চীন। কারণ রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট থাকার সময়ই শ্রীলংকায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ও প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল চীন। বেইজিংয়ের রাজনৈতিক মহলে রাজাপাকসের অনেক বন্ধু। রাজাপাকসে পরিবারেও চীনের শুভাকাঙ্ক্ষী কম নয়। দক্ষিণ শ্রীলংকার ঐতিহ্যবাহী এ রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের গড়া একাধিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় আছে চীনের সংযোগ।

প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ায় রাজাপাকসেকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন। শ্রীলংকায় চীনের রাষ্ট্রদূত চেং জুইয়ান গতকাল সন্ধ্যায় কলম্বোয় রাজাপাকসের বাসভবনে গিয়ে তাকে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে দেন। সাক্ষাত্কালে রাষ্ট্রদূত শ্রীলংকায় আগামী দিনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের ব্যাপক সমর্থন থাকবে বলে আশ্বাস দেন।

চীনা রাষ্ট্রদূত যখন রাজাপাকসের বাসভবনে ছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন টেম্পল ট্রিতে বিদেশী মিশনপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন পদচ্যুত রনিল বিক্রমাসিংহে। এর আগে বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী দাবি করে তিনি বলেন, পার্লামেন্টে বেশির ভাগ সদস্যের সমর্থন যার থাকে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হন। নিজের পক্ষে আস্থা প্রমাণের জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানান তিনি। এর কিছুক্ষণ পরই শ্রীলংকার পার্লামেন্ট আগামী ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে বলে স্পিকারের কার্যালয় থেকে জানানো হয়।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বলেছে, শ্রীলংকায় রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হয়নি। ভারতের দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, দিল্লিতে সাউথ ব্লকের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কর্মকর্তারা চুপ থাকলেও শ্রীলংকার রাজনৈতিক সংকটের ঢেউ পক প্রণালির এ পাড়েও কিছুটা আছড়ে পড়ছে।

ন্যাশনাল হেরাল্ডের খবরে প্রকাশ, ভারতের সরকারবিরোধী জোটের শরিক দল ডিএমকে শ্রীলংকায় সংকটের জন্য বিজেপি সরকারকে দায়ী করেছে। দলের নেতা এমকে স্ট্যালিন বলেছেন, বিজেপি সরকারকে রাজাপাকসের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।

সরকারের ব্যর্থতার কারণে শ্রীলংকায় তামিলদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে অথবা মত্স্যজীবীরা বাধা পেলে তামিলনাড়ুতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি জানান।

রাজনৈতিক ঝুঁকি-বিষয়ক পরামর্শক সংস্থা ইউরেশিয়া গ্রুপের পরিচালক (এশিয়া) শৈলেশ কুমার বলেন, সিরিসেনা তার রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে রাজাপাকসেকে এনেছেন। এ পটপরিবর্তনে আবার খুলে যাবে চীনা অর্থের দুয়ার। শ্রীলংকার অর্থনীতিতেও চীনের প্রভাব ফিরে আসবে। কারণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চীন একজন বন্ধু পাবে, যেটা রনিল বিক্রমাসিংহের সময় সম্ভব হতো না।

শ্রীলংকার রাজস্ব আয়ের ৮০ শতাংশ এখন ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়। ২০০৫-১৫ সময়কালে রাজাপাকসে ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে নির্বিচারে ঋণ নেয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। অনেকে রাজাপাকসেকে দায়ী করেন শ্রীলংকার আর্থিক ব্যবস্থাপনার এ দুর্গতির জন্য।

মাইথ্রিপালা সিরিসেনার সঙ্গে রনিল বিক্রমাসিংহের টানাপড়েন চলছিল বছরখানেক ধরে। বিশেষত সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগকে ঘিরে দুজনের মতবিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। বিগত সরকারের আমলে চীনের ওপর শ্রীলংকার যে নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল তার জেরে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিও হয়ে পড়েছিল এককেন্দ্রিক। প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে এজন্য ভারত ও অন্যান্য দেশের বিনিয়োগ টানতে চেয়েছিলেন।

ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জেরে গত মার্চে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ন্যাশনাল অপারেশনস রুমসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে নেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। এরপর গত সপ্তাহে কলম্বো বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রিসভার আলোচনায় দুজন উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে লিপ্ত হন। সিরিসেনা ওইদিন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ করেন। এরপর শুক্রবার তিনি বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করেন।

পাঁচ দশক ধরে পার্লামেন্ট সদস্য রনিল বিক্রমাসিংহে শ্রীলংকার পররাষ্ট্রনীতিতে বরাবরই ভারসাম্য রাখতে প্রয়াসী ছিলেন। চীনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থেকে সরে তিনি ভারত ও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে চেয়েছেন। তবে তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় জনগণের হতাশা বাড়ছিল বলে জানান কলম্বো ব্রোকারেজ হাউজ সিটি সিএলএসএর স্ট্র্যাটেজিস্ট সঞ্জিবা ফার্নান্দো। তার ভাষায়, মানুষ ভাবছিল কিছুই ঠিক চলছে না। এটা আসলে সেন্টিমেন্টের বিষয়। সব মিলিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে একটা আবহ গড়ে উঠেছিল।

শ্রীলংকার এ পরিবর্তনে বদলে যাবে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত শক্তিসাম্য। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা ভারত চাইছে আশপাশে নিজের প্রভাববলয় গড়ে তুলতে। আর অচিরেই বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ হতে যাওয়া চীন চায় ভারতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ভারত মহাসাগরে অবাধ চলাচল চীনের জন্য জরুরি। মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা ভারত এক্ষেত্রে বাধা হতে পারে। ভারত মহাসাগরে পারস্পরিক প্রভাবের এ দ্বৈরথে গত মাসে চীন কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল মালদ্বীপে তাদের বন্ধুভাবাপন্ন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের নির্বাচনী পরাজয়ে। শ্রীলংকায় শুক্রবারের পালাবদল বেইজিংকে ওই ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে।