‘পারমাণবিক বিপর্যয়ে দায়ী থাকবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা’

শনিবার, আগস্ট ১৩, ২০২২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউরোপের সবচেয়ে বড় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপোরিজ্জা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। কিয়েভের দাবি, সেখানে সমরাস্ত্র জমা করে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে রুশ সেনারা। পাল্টা অভিযোগ করে কিয়েভ বলছে, ইউক্রেনীয় সেনারা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গোলা নিক্ষেপ করছে।

রাশিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদে বলেছেন, কিয়েভের বেপরোয়া কর্মকান্ড বিশ্বকে বড় পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার আমাদের পশ্চিমা সহকর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছি যে, তারা কিয়েভের সঙ্গে কথা বলতে ব্যর্থ হলে, এটি সবচেয়ে জঘন্য ও বেপরোয়া পদক্ষেপ নেবে, যার পরিণতি ইউক্রেনের বাইরেও পড়বে।’

ভ্যাসিলি এ সময় পশ্চিমাদের উদ্দেশে বলেন, যে কোনো পারমাণবিক বিপর্যয়ের জন্য কিয়েভের পশ্চিমা সমর্থকদেরই দায় বহন করতে হবে।

তার মতে, পারমাণবিক অবকাঠামোতে কিয়েভের অপরাধমূলক আক্রমণ বিশ্বকে একটি পারমাণবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে যা চেরনোবিলের মতো ঘটনার জন্ম দেবে এবং ইউরোপকে সবচেয়ে বড় তেজস্ক্রিয় দূষণের দিকে নিয়ে যাবে। এর প্রভাব রাজধানী কিয়েভসহ অন্তত আটটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক ছাড়াও মলদোভা, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও বেলারুশেরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
‘পারমাণবিক বিপর্যয়ে দায়ী থাকবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা’
জাতিসংঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া

নেবেনজিয়া আরও বলেন, এই ধরনের মাত্রার পারমাণবিক বিপর্যয় কল্পনা করা কঠিন।

রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইউক্রেনীয় শহর এনারগোদারে অবস্থিত জাপোরিজ্জা প্ল্যান্টটি গত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ ধারাবাহিক হামলার শিকার হচ্ছে।

চীন সমস্যা সমাধানে ইউক্রেন ও রাশিয়াকে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির জন্য রাশিয়াকেই দায়ী করছে।

গত ৬ আগস্ট ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শনিবার রাশিয়ার রকেট হামলায় পারমাণবিক স্থাপনার গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। তিনটি তেজস্ক্রিয় শনাক্তকরণ যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যে কোনো তেজস্ক্রিয় লিকের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় তা শনাক্তকরণ ও বিকিরণ প্রতিরোধ অসম্ভব হয়ে গেছে।

কিয়েভ বলছে, এবার ভাগ্যক্রমে পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেলেও বার বার ভাগ্য সহায় হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে আইএইএ প্রধান রাফায়েল মারিয়ানো গ্রসি বলেছেন, ইউরোপের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গোলাগুলির খবরে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

জাতিসংঘের আণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা (আইএইএ) ইউক্রেনের জাপোরিজ্জা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে যে কোনো ধরণের সামরিক পদক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

গ্রসি বলেছেন, শুক্রবারের হামলা পারমাণবিক বিপর্যয়ের সত্যিকারের ঝুঁকি তৈরি করেছে যা ইউক্রেন এবং এর বাইরে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

আমরা বারবার আমাদের পশ্চিমা সহকর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছি যে, তারা কিয়েভের সঙ্গে কথা বলতে ব্যর্থ হলে, এটি সবচেয়ে জঘন্য ও বেপরোয়া পদক্ষেপ নেবে, যার পরিণতি ইউক্রেনের বাইরেও পড়বে।

তিনি বলেন, ইউক্রেনীয় কর্মীদেরর অবশ্যই হুমকি ও চাপ ছাড়াই তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে এবং আইএইএকে প্রযুক্তিগত সহায়তার অনুমতি দেয়া উচিত।

গ্রসি আরও বলেন, ইউক্রেন এবং অন্যত্র একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে জনগণকে রক্ষা করার স্বার্থে আমাদের মতভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তবে মস্কোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।

জাপোরিজ্জায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রুশ প্রধান ইয়েভজেনি বালিতস্কি রোবরার টেলিগ্রামে এক বার্তায় বলেন, ইউক্রেনীয় সেনারাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেলের মজুত লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলায় প্রশাসনিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘পারমাণবিক বিপর্যয়ে দায়ী থাকবে ইউক্রেনের পশ্চিমা মিত্ররা’
জাপোরিজ্জা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রহরারত রুশ সেনা

তবে নিরপেক্ষভাবে কিয়েভ ও মস্কোর দাবির সত্যতাই যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

যেহেতু পারমাণবিক প্রকল্পটি রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে এবং সেখানে রুশ সেনারাই অবস্থান করছে, তাহলে ঠিক কী কারণে রুশ সেনারাই সেখানে হামলা চালাবে তা স্পষ্ট করেনি কিয়েভ।

এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘পারমাণবিক প্রকল্পে যে কোনো বোমা হামলা নির্লজ্জ অপরাধ, সন্ত্রাসের কাজ।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গত সপ্তাহের শুরুর দিকে অভিযোগ করেছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর জন্য এই প্ল্যান্টটিকে নিরাপদ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া। কারণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকায় ইউক্রেনীয় সেনারা সেখানে গোলা বর্ষণ করতে পারবে না।

গত মার্চে ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের মধ্যেই দেশটিতে অবস্থিত ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাপোরিজ্জাতে হামলা চালায় রুশ সেনারা। ইউক্রেন সে সময় দাবি করে, রুশ গোলার আঘাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আগুন ধরে যায়।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্র কুলেবা জানিয়েছিলেন, এই কেন্দ্রের চুল্লি গলে যাওয়া চেরনোবিলের থেকে ১০ গুণ বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

এর আগে ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিলে সোভিয়েত আমলে এক পারমাণবিক দুর্ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পারমাণবিক প্রযুক্তির ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।

২০০৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর ২০ বছরে তেজস্ক্রিয়তার পরোক্ষ প্রভাবে প্রায় ৪ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।