পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় নারীর ১০ বৈশিষ্ট্য

রবিবার, জুলাই ৩১, ২০২২

ধর্ম ডেস্ক: পবিত্র কোরআনের অনেক জায়গায় আল্লাহ তাআলা নারীদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাদের উল্লেখ করেছেন কন্যা, বোন, মা, নারী, স্ত্রী, যুবতি, মুমিনা, মুসলিমা ইত্যাদি শব্দে। নারীদের সামগ্রিক আলোচনার পাশাপাশি কিছু নারীর প্রশংসামূলক বর্ণনা এসেছে। আরও এসেছে পাপী নারী ও তার পরিণতির কথাও। কোরআনে নারীর আলোচনা যেভাবেই আসুক না কেন, তা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। নিচে কোরআনে বর্ণিত নারীর ১০টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো।

১) চারিত্রিক পবিত্রতা: অশ্লীল ও অমার্জিত আচরণ নয়, বরং সংযত চলাফেরা, দৃষ্টি অবনত রাখা ও লজ্জাস্থানের হেফাজত মুমিন নারীর অনন্য গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন নারীকে বলুন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর: ৩১)

আল্লাহ তাআলা শুধু নারীদের সাধ্বী হওয়ার নির্দেশ দেননি; বরং সাধ্বী নারীর প্রশংসাও করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘ইমরানের কন্যা মারইয়াম—যে তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করেছে।’ (সুরা তাহরিম: ১২)

২) লজ্জা ও শালীনতা: লজ্জা ও শালীনতা মুমিন নারীর মর্যাদা ও সৌন্দর্যের ভিত্তি, যা তার পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রয়োজন। নারী এমনভাবে চলাফেরা করবে না, যা মানুষকে পাপে উদ্বুদ্ধ করে। পবিত্র কোরআনে এক নারীর শালীন আচরণের প্রশংসায় বর্ণিত হয়েছে, ‘তখন নারীদ্বয়ের একজন লজ্জাজড়িত পায়ে তার কাছে এলো।’ (সুরা কাসাস: ২৫)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘.. তারা যেন তাদের গোপন আবরণ প্রকাশের জন্য সজোরে পা না ফেলে। হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করো। যেন তোমরা সফল হও।’ (সুরা নুর: ৩১)

৩) জিহ্বার ব্যাধি: জিহ্বার ব্যাধি বলতে অর্থহীন কথা, পরচর্চা, অশ্লীলতা, অভিশাপ, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, গোপনীয়তা প্রকাশ, মিথ্যা কথা ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা শুধু পুরুষকে নয়, নারীকেও এসব ব্যাধির ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো নারী যেন অপর নারীকে উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয়েছে সে উপহাসকারিণীর চেয়ে উত্তম হতে পারে।’ (সুরা হুজরাত: ১১)

৪) দীন পালনে পুরুষের সহযোগী: দীন পালন ও প্রতিষ্ঠায় পুরুষের সহযোগী নারী। এটি মুমিন নারীর বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও নারী পরস্পরের বন্ধু। তারা সত্কাজে আদেশ করে, অসৎ কাজে নিষেধ করে, তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা: ৭১)

৫) পুরুষের মানসিক আশ্রয়: বাহ্যত পুরুষ নারীর অভিভাবক হলেও আল্লাহ নারীকে পুরুষের মানসিক আশ্রয় বানিয়েছেন এবং দাম্পত্য জীবন সুখময় করতে তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহর নিদর্শন হলো—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের ভেতর থেকে সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও। তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রোম: ২১)

৬) বংশীয় অহংকার: কোরআনে এমন অহঙ্কারের ব্যাপারে নারীকে সতর্ক করা হয়েছে। মহানবী (স.) জয়নব বিনতে জাহাস (রা.)-কে জায়েদ বিন হারিসা (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দিতে চাইলে তিনি তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। কেননা তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের আর জায়েদ (রা.) আগে দাস ছিলেন। এই জাত্যভিমানের ব্যাপারে ইরশাদ হয়, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ বা কোনো মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।’ (সুরা আহজাব: ৩৬)

৭) স্বামীর আনুগত্য ও আত্মত্যাগ: ইসলামি শরিয়ত অনুমোদিত বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা এবং সুখে-দুঃখে তাঁর পাশে থেকে সাহস জোগানো মুমিন নারীর বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রীর প্রশংসা করেছেন —যিনি চরম অসুস্থতা ও দরিদ্রতার মধ্যেও স্বামীর পাশে ছিলেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, আমার বান্দা আইয়ুবকে, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো। এই তো গোসলের সুশীতল পানি ও পানীয়। আমি তাকে দান করেছিলাম তাঁর পরিজনবর্গ ও তাদের মতো আরো, আমার অনুগ্রহস্বরূপ এবং বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য উপদেশস্বরূপ।’ (সুরা সাদ: ৪১-৪৩)

৮) মোহনীয় বাকভঙ্গি: নারীর রূপ, ভঙ্গি ও কথার মোহময়তা সর্বজনবিদিত। রূপের মতো কথার মায়াজালেও সে আটকাতে পারে পুরুষকে। দুর্বল চরিত্রের পুরুষ সহজেই মোহগ্রস্ত হয় তার কথায়। পবিত্র কোরআনে নারীর কথার জাদুময়তার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়।’ (সুরা আহজাব: ৩২)

কোরআনের ব্যাখ্যাকারগণ এই আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, কথার এই কোমলতা ও মোহনীয় ভঙ্গি নারীর বিশেষ গুণ। যা তার স্বামী ও আপনজনের জন্য যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি দুর্বল ঈমানের পুরুষ—যার প্রলুব্ধ হওয়ার ভয় আছে তার সামনে তা প্রকাশ করা নিন্দনীয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ও তাফসিরে তাবারি)

৯) ঈর্ষা: ঈর্ষা কখনও নারীর ভেতরে প্রবল হয়ে ওঠে। মহানবী (স.)-এর কয়েকজন স্ত্রী এই প্রবণতার শিকার হলে আল্লাহ তাঁদের সতর্ক করে বলেন, ‘স্মরণ করো—নবী তাঁর স্ত্রীদের একজনকে গোপন একটি কথা বলেছিলেন। অতঃপর যে যখন তা অন্যকে বলে দিল এবং আল্লাহ তা নবীকে জানিয়ে দিলেন, তখন নবী এই ব্যাপারে কিছু ব্যক্ত করলেন এবং কিছু অব্যক্ত রাখলেন। যখন নবী তা সেই স্ত্রীকে জানালেন, তখন সে বলল, আপনাকে এটা কে অবহিত করল। নবী বললেন, আমাকে অবহিত করেছেন তিনি, যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবগত।’ (সুরা তাহরিম: ৩)

১০) মার্জিত ভাষা: আল্লাহ তাআলা নারীদের মার্জিত ভাষা ব্যবহার করতে বলেছেন। যা অস্পষ্টতা, জড়তা ও পাপের ইঙ্গিতবহ হবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ন্যায়সংগতভাবে কথা বলো।’ (সুরা আহজাব: ৩২)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘কাওলাম-মারুফা’-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘নারীরা অনুচ্চ ভাষায় এমনভাবে কথা বলবে, যা শরিয়ত নিষেধ করেনি এবং মানুষের কাছেও তা শুনতে খারাপ মনে হয় না।’ (তাফসিরে কুরতুবি)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘নারীরা সুন্দর, মার্জিত ও কল্যাণবহ কথা বলবে।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সকল নারীকে তাদের বৈশিষ্ট্যে নিয়ে কোরআনের নির্দেশনাগুলো মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।