যে কারণে ভাসমান শহর গড়ছে মালদ্বীপ

বৃহস্পতিবার, জুন ২৩, ২০২২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। বিলাসবহুল ভ্রমণ ও মৎস সম্পদের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু হাজারো দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ হুমকিতে রয়েছে। সেই অবস্থা মোকাবেলায় দেশটি নতুন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেটা হলো ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলরাশির ওপর জেগে উঠছে এক শহর। রাজধানী মালে থেকে নৌকায় ১০ মিনিটের দূরত্বে, ফিরোজারঙা এক হ্রদের ওপর নির্মাণাধীন এই শহরে থাকতে পারবেন ২০,০০০ মানুষ। আর সবচেয়ে বড় চমক হলো, পুরো শহরটাই হবে ভাসমান! মূলত কোনো বিলাসব্যসন বা ভবিষ্যতের মডেল হিসেবে নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো নির্মম বাস্তবতার সাথে মোকাবিলা করতেই নির্মাণ করা হচ্ছে শহরটি।

উপর থেকে ব্রেইন কোরালের মতো দেখতে এই শহরে থাকবে ৫০০০ ভাসমান বাড়ি, রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট এবং বিদ্যালয়। আর এগুলোর মধ্যে দিয়েই বয়ে যাবে ছোট ছোট খাল। মালদ্বীপের এই আশ্চর্য শহর দেখার জন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে না বিশ্বকে। চলতি মাসেই শহরের প্রথম একটি ইউনিট উন্মোচিত হবে এবং ২০২৪ সালের শুরুর দিকে বাসিন্দারা এখানে থাকা শুরু করবেন। আর পুরো শহরের নির্মাণকাজ শেষ করতে লেগে যাবে ২০২৭ সাল।

প্রপার্টি ডেভেলপার ডাচ ডকল্যান্ডস এবং মালদ্বীপ সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এই ভাসমান শহর। কিন্তু কোনো বিলাসব্যসন বা ভবিষ্যতের মডেল হিসেবে নয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার মতো নির্মম বাস্তবতার সাথে মোকাবিলা করতেই নির্মাণ করা হচ্ছে শহরটি।

১১৯০টি ছোট-বড়, নিচু দ্বীপ মিলিয়ে গঠিত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। দেশটির আশি ভাগেরও বেশি স্থলভাগ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উপরে। এই শতকের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরো এক মিটার বেড়ে গেলে সমগ্র মালদ্বীপই পানির নিচে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু যদি ভাসমান শহর নির্মাণ করা হয়, তাহলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এটিও উপরেই ভেসে থাকবে। তাই মালদ্বীপের ৫ লাখ মানুষের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে এ শহর, জানান শহরটির নকশাকারক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াটারস্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা কোয়েন অলথুইস।

তিনি আরো বলেন, “আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে পানির উপর ভাসমান শহরও নিরাপদ। এখানেও সুলভ মূল্যে বাড়ি মিলবে এবং অনেক মানুষও থাকতে পারবে। মালদ্বীপ ভবিষ্যতে জলবায়ু শরণার্থী নয়, বরং জলবায়ু উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত হবে।”

ভাসমান স্থাপত্যের প্রাণকেন্দ্র

নেদারল্যান্ডসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা স্থপতি অলথুইসের জীবন কেটেছে পানির সঙ্গে মিতালি করে। কারণ তার জন্মভূমি নেদারল্যান্ডসের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়েও নিচু। মায়ের দিক থেকে অলথুইসের পরিবার ছিল জাহাজ নির্মাণের সাথে যুক্ত এবং বাবার দিক থেকে প্রকৌশলী ও স্থপতি। তাই দুটি মিলিয়েই ‘ওয়াটারস্টুডিও’ প্রতিষ্ঠা করা যেন অলথুইসের ভাগ্যের লিখন ছিল! তার এই প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র পানির উপর ভবন নির্মাণ কাজের সাথে যুক্ত।

তবে অলথুইস জানান, আগেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা ছিল, কিন্তু বর্তমানের মতো এত প্রকট হয়ে ওঠেনি যে শুধুমাত্র ভাসমান ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করেই একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায়। সেসময় মূল সমস্যা ছিল জায়গার সংকট। শহরগুলো বিস্তৃত হচ্ছিলো, কিন্তু সেগুলোকে ধার‍ণ করার মতো জায়গা ফুরিয়ে আসছিলো।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন একটি মূল ‘অনুঘটক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ভাসমান স্থাপত্যই এখন মূলধারায় চলে আসছে আস্তে আস্তে, বলেন অলথুইস। তার প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াটারস্টুডিও’ এযাবত ৩০০ ভাসমান বাড়ি, অফিস, স্কুল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নির্মাণ করেছে।

আর এ উদ্যোগের একটি মূল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নেদারল্যান্ডস। দেশটিতে একটি ভাসমান পার্ক, ডেইরি ফার্ম ও অফিস ভবন রয়েছে এবং এটি গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপ্টেশন (জিসিএ)- এর সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত= হয়। জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিভিন্ন সমাধান বের করতে কাজ করে এই সংস্থা।

জিসিএ- এর সিইও প্যাট্রিক ভারকুইজেন মনে করেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে থাকার ফলে ভাসমান স্থাপত্য বাস্তবিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি স্মার্ট সমাধান হয়ে দাঁড়াবে। তার ভাষ্যে, “আমাদের যেকোনো একটাকে বেছে নিতে হবে, হয় আমরা দেরি করবো এবং এর মূল্য চুকাবো; নাহয় আমরা পরিকল্পনা করবো এবং উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবো। ভাসমান অফিস ও ভবনগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আমাদের পরিকল্পনারই অংশ।”

রিইনস্যুরেন্স এজেন্সি ‘সুইস রে’- এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধুমাত্র বন্যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ৮২ বিলিয়ন ডলার। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট এর অনুমান, ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি শহুরে সম্পদ বার্ষিক উপকূলীয় ও নদী বন্যা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাধারণ শহর, কিন্তু ভাসমান

৫ বছরেরও কম সময়ে ২০,০০০ মানুষের জন্য একটি ভাসমান শহর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে মালদ্বীপ। ভাসমান শহর নির্মাণের আরো কিছু প্রকল্প আরম্ভ হয়েছে; যেমন- দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ওসেনিক্স সিটি এবং বাল্টিক সাগরে ডাচ কোম্পানি ব্লু ২১ এর বেশকিছু ভাসমান দ্বীপ। কিন্তু কোনোটিই এই সময়সীমার সাথে পেরে ওঠেনি।

মালদ্বীপের এই ভাসমান শহরের প্রতি জনসাধারণকে আকৃষ্ট করতে শহরকে রংধনুর রঙে সাজিয়েছে ওয়াটারস্টুডিও। এছাড়াও আছে, প্রশস্ত ব্যালকনি এবং সমুদ্রের দিকে মুখ করা ঘর। এ শহরের বাসিন্দারা চাইলে নৌকায় করে ঘুরতে পারবেন, হাঁটতেও পারবেন, আবার চাইলে বালুকাময় পথে সাইকেল বা ইলেক্ট্রিক স্কুটারে করেও ঘুরতে পারবেন।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, শহরটি অনেক জায়গা নিয়ে তৈরি হবে যা রাজধানীতে পাওয়া মুশকিল। মালদ্বীপের রাজধানী মালে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটারের এই রাজধানী শহরে এখন ২ লাখেরও বেশি মানুষের বাস! অলথুইস জানান, এখানে বাড়িঘরের দামও হুলহুমালে’র (কাছেই অবস্থিত ভাসমান কৃত্রিম দ্বীপ) সমপর্যায়ের। এখানে স্টুডিওর দাম শুরু ১৫০,০০০ ডলার থেকে এবং বাড়ির (ফ্যামিলি হোম) দাম শুরু ২৫০,০০০ ডলার থেকে।

শহরের জন্য মডিউলার ইউনিটগুলোকে স্থানীয় শিপইয়ার্ডে আলাদাভাবে বানানো হয়েছে এবং পরে ভাসমান শহরে নিয়ে যাওয়া হবে। নিচে একটি বিশাল কংক্রিটের কাঠামোর উপর এগুলো বসানো হবে। এই কংক্রিট কাঠামো আবার টেলিস্কোপিক স্টিলের পিলারের সাহায্যে সমুদ্রতলে আটকানো। ঢেউয়ের ওঠানামার সাথে সাথে এটিও ওঠানামা করবে। তবে শহরকে ঘিরে থাকা প্রবালদ্বীপ এখানে প্রাকৃতিক ‘ওয়েভ ব্রেকার’ হিসেবে কাজ করে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে। এটি শহরের বাসিন্দাদের ঢেউয়ের দুলুনিতে অসুস্থ হওয়া থেকে প্রতিরোধ করবে।

অলথুইস এও জানিয়েছেন, এই শহর নির্মাণে ফলে জলজ জীব ও পরিবেশের ক্ষতি হবে কিনা তা স্থানীয় প্রবাল বিশেষজ্ঞরা বিশদভাবে দেখেছেন এবং নির্মাণের আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শহরটি নির্মাণের লক্ষ্য হলো, স্বনির্ভর হওয়া এবং ভূমির উপর যেসব কাজ করা যায়, তার সবই এই ভাসমান শহরে করা যাবে। এখানে মূলত সৌরবিদ্যুৎ থাকবে। তবে এসির পরিবর্তে সমুদ্রের গভীর থেকে পাম্প করে ঠান্ডা পানি হ্রদে এনে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘর শীতল রাখা হবে। এর ফলে শক্তি অপচয় হবে না।

মালদ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাসমান শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে অলথুইস এ ধরনের স্থাপত্যকে আরও অগ্রসর পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। তিনি মনে করেন, ভাসমান ভবন নির্মাণ এখন শুধু অতি ধনীদের বিলাসী শখ হয়ে থাকবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের প্রতি একটা জবাব দেওয়া হবে। আর সেটা বাস্তবধর্মী এবং সুলভ একটা উপায়ই হবে। খবর সিএনএন।