সরকারি অর্থে পুকুর খননে ‘সাগর চুরি’!

মঙ্গলবার, জুন ২১, ২০২২

কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়ায় সরকারি অর্থে জলমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় জেলা মৎস্য বিভাগ থেকে ১৬টি পুকুর পুনঃখননে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ যেন পুকুর খনন করতে গিয়ে ‘সাগর চুরির’ ঘটনা!

শুধু তাই নয়, সরকারি জমিতে জলাশয় সংস্কারের নামে ২০২০-২১অর্থ বছরের নেওয়া অনাপত্তিপত্র সনদ দিয়েই জালজালিয়াতির মাধ্যমে চলতি ২০২১-২২অর্থবছরের নতুন প্রকল্প দেখিয়ে সেই প্রকল্পের টাকাও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে।

আর যা ঘটেছে সবই জেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের তেলেসমাতিতেই। নামমাত্র খনন, মনগড়া পিআইসি কমিটি করে খননের কাজ না করেই জেলা মৎস্যের উপসহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিয়া’রা প্রকল্পের অর্থ পকেটে ভরেছেন। এ কাজে মাঠ পযার্য়ে জড়িত ছিলেন সদর উপজেলা মৎস্য অফিসার সুদীপ বিশ্বাস।

সরকারি অর্থে পুকুর খননের জন্য কাগজে-কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইসি) কমিটি গঠন করা হয়। বাস্তবে এসব কাজ বাস্তবায়ন করেন জেলা মৎস্য অফিসার নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ও একই অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিয়া।

এতেই থেমে থাকেননি সোহেল মিয়া। নানা কারসাজির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাত করতেও নিজেই দালাল চক্র সৃষ্টি করেছেন। আর তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি নিজেই।

অভিযোগ উঠেছে, কুষ্টিয়ার রেজা নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রকল্প আসার আগেই প্রকল্প পাইয়ে দিতে ৮লক্ষ টাকা নিয়েছেন।

এছাড়াও পান্না নামের এক ব্যক্তিকে ১ কোটি টাকার কাজ দেওয়ার কথা দিয়ে প্রায় ১৬ লাখ টাকা। রহিদুল নামের অপর এক ব্যক্তিকে ২০লাখ টাকা বরাদ্দ করিয়ে দিতেও ৫ লাখ টাকা আগেই নিয়েছেন এই প্রকৌশলী। এদের মধ্যে রহিদুল ছাড়া অন্যদেরকে কথামতো টাকা এবং প্রকল্প দিতে না পারায় এবং রেজার কাছ থেকে বার বার টাকা নেওয়ায় বেঁধেছে গোলযোগ।

এদিকে রেজা নামের ঐ ব্যক্তি গত ৩০মার্চ, পান্না গত ১৭ এপ্রিল এবং রহিদুল গত ২৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলা মৎস্য অধিদপ্তর এসে তান্ডব চালালেও কেউই কোনো প্রতিবাদ করেননি। অফিস ও তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রকৌশলী সোহেল মিয়াকে দেওয়া হয়েছে বাড়তি দায়িত্ব। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই বিভিন্নভাবে এসব টাকা লুটপাট করেছেন তিনি।

নামমাত্র কাজ করে পিআইসি কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে বরাদ্দ হওয়া অর্থের ব্যাংক চেক সই করে নিয়ে সেই টাকা নিজেদের পকেটে ভরছেন তারা। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলার চার উপজেলায়। এরমধ্যে দৌলতপুর, মিরপুর, ভেড়ামারা ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় মাছচাষ বাড়াতে পুকুর খননের জন্য বরাদ্দকৃত ১কোটি ৮৫ লক্ষেও বেশি টাকা এভাবেই লুটপাট করেছেন কুষ্টিয়া জেলা মৎস্য অফিসের এই দুই কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্প গুলোর পিআইসি কমিটির সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের সাথে কথা বলে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঝিনাইদহ জেলায় থাকাকালীনও প্রকৌশলী সোহেল মিয়ার বিরুদ্ধেও উঠেছিল নানান অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি কলটি রিসিভ করেননি।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা মৎস্য অফিসার সুদীপ বিশ্বাসের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি কিছু অভিযোগের বিষয় স্বীকার করলেও এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

কুষ্টিয়ার জেলা মৎস্য অফিসার নৃপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন,কাগজে কলমে সবই ঠিকঠাক করে রেখেছি। ভুল ধরার সুযোগ নেই। বোঝেন তো এখানে রাজনৈতিক চাপ থাকে। আমার ওপরের কর্মকর্তাসহ সবাইকে ম্যানেজ করে আমি কাজ করি। ভুল না ধরে তার পক্ষে খবর প্রকাশ করতেও পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

প্রকল্প পরিচালক মো. আলিমুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া জেলার ৪টি উপজেলার দৌলতপুর, মিরপুর, ভেড়ামারা ও সদর উপজেলায় জেলা মৎস্য বিভাগ থেকে ১৬টি পুকুর পুনঃখননে মাছচাষ বাড়াতে পুকুর খননের জন্য বরাদ্দকৃত ১কোটি ৮৫ লক্ষেও বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাজ গুলো শুনেছি শেষের দিকে। কাজে অনিয়ম হলে কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। আমাকে এ বরাদ্দকৃত টাকার ভাগ দেওয়া হয়েছে এটি সঠিক নয়, মিথ্যা ও বানোয়াট কথা বলেছেন তারা। নিজেরা অনিয়ম করে আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ খবর নিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।