দুদকের চাকরির বিধান নিয়ে কেন বিতর্ক!

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২২

ঢাকা : বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর কোন নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করার বিধান নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। একজন কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির ঘটনার পর এনিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন এবং তদন্তকারী কর্মকর্তারা পরস্পর বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জোট বেঁধে এই বিধান বাতিলের দাবি তুলেছেন এবং তারা অভিযোগ করেছেন, আমলা এবং রাজনীতিকসহ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করায় সম্প্রতি একজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেজন্য তারা দুদকের চাকরিবিধির এই বিধানকে খড়্গ হিসাবে দেখছেন।

তবে দুদক কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা যাতে মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, সেজন্য এই চাকরিচ্যুতির বিধান বহাল রাখা প্রয়োজন।

দুদকের স্থায়ী কর্মকর্তা কর্মচারীদের কারণ দর্শানোর কোন নোটিশ না দিয়েই চাকরি থেকে অপসারণের বিধান রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির চাকরিবিধিতে। তবে চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে কোন কৈফিয়ত নেয়া না হলেও তিন মাসের বেতন দেয়ার বিষয় রয়েছে ঐ বিধানে।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের আপত্তি কোথায়

কয়েকদিন আগে একজন উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে এই বিধি ব্যবহার করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে দুদকের কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে।

দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তারা কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া চাকরিচ্যুত করার বিধান বাতিলের দাবি নিয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার কথাও বলছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, তাদের ওপর এই বিধানের অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে।

দুদকের সাবেক একজন মহাপরিচালক মহিদুল ইসলাম বলেছেন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায় চাকরিবিধি প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং তাতে এই বিধান আনার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির তদন্তকারী কর্মকর্তারা সবসময় চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকেন।

“একটি অস্বাভাবিক সরকারের (সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সময়ে প্রণয়ন করা এই চাকরিবিধিতে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এটা দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির ক্ষেত্রে একটা খড়্গ বা হুমকি,” বলছেন দুদকের সাবেক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম।

তিনি মনে করেন, যে কোন সময়, কোন কারণ ছাড়াই চাকরি চলে যেতে পারে এই বিধানের কারণে, ফলে এটা ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্তে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলে তার মত।

“ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত যে কর্মকর্তারা করবেন, তারাই যদি চাকরি নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন-সেটা বাঞ্চনীয় নয়,” বলেন মহিদুল ইসলাম।

দুদকের কর্মকর্তা যারা সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক পদে রয়েছেন-তারাই মূলত মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে থাকেন। তাদের এবং কর্মচারীদের দুদক সরাসরি নিয়োগ করে।

এছাড়া দুদকের পরিচালক, মহাপরিচালক এবং সচিব পদে ডেপুটেশনে বা প্রেষণে আনা হয় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের।

এই কর্মকর্তারা দুদকের চাকরিচ্যুতির ঐ বিধানের আওতায় পড়েন না। দুদকের চেয়ারম্যান এবং কমিশনারদের ক্ষেত্রেও ঐ বিধান প্রযোজ্য হয় না। সেখানে তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাদের জন্য চাকরিচ্যুতির আলাদা বিধান নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন।

অপপ্রয়োগের সুযোগ কতটা?

দুর্নীতির মামলা এবং ফৌজদারি অপরাধ নিয়ে কাজ করেন আইনজীবী ফাউজিয়া করিম। তিনি বলছেন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে যেহেতু দুর্নীতির তদন্ত করতে হয়, সেজন্য নোটিশ ছাড়া চাকরিচ্যুতির বিধানের অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকে।

“এ ধরনের বিধানে সহজেই একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা ভিকটিম (ক্ষতিগ্রস্ত) হতে পারেন। এই ধারাটির অ্যাবিউজ (অপপ্রয়োগ) হওয়ার সুযোগ থেকে একশো ভাগ,” বলেন আইনজীবী ফাউজিয়া করিম।

তিনি আরও বলেন, “কোন দোষ না করলেও এভাবে চাকরিচ্যুত করা হলে তাতে ন্যাচারাল জাস্টিজ ডিনাই করা হচ্ছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটাও কেড়ে নেয়া হচ্ছে।”

এখন শরীফ উদ্দিন নামের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার পর ঐ কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে আমলা এবং রাজনীতিকসহ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে চার্জশিটের সুপারিশ করায় তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে।

এর আগে কারণ দর্শানোর কোন নোটিশ না দিয়ে চাকরিচ্যুত করার দুদকের বিধানের ৫৪ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল তদন্তকারী আরেকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালে।

তখন ঐ কর্মকর্তার রিট মামলায় হাইকোর্ট বিধানটি বাতিলের রায় দিয়েছিল। আপিল বিভাগও হাইকোর্টে রায় বহাল রেখেছিল।

তবে দুদকের রিভিউ আবেদনের প্রেক্ষাপটে আপিল বিভাগে বিধানটি বাতিলের আদেশ স্থগিত করে।

এদিকে, দুদক কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসন এই বিধানের অপপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করছে।

দুদক আইনজীবী যা বলছেন

দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলেছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই যাতে তাকে হয়রানি করা না হয়, সেজন্য চাকরিচ্যুতির এই প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “এ ধরনের প্রভিশন (বিধান) যদি না থাকে, তাহলে খুব রিস্কি (ঝুঁকিপূর্ণ) হবে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স (ভারসাম্য) করার ক্ষেত্রে। ”

“কারণ আইনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা সীমিত। আমি যদি তদন্ত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারি, তাহলেতো আনরুলি (আইনে বাইরে বেপরোয়া) হয়ে যাবে,” বলেন আইনজীবী খুরশিদ আলম।

তিনি উল্লেখ করেন, চাকরিচ্যুতির এই বিধান ব্যবহার করার অর্থ হচ্ছে সতর্ক করে দেয়া যে, এটা আইন বহির্ভূত কাজের জন্য করা হয়েছে। যাতে বাকিরা সতর্ক হয়।

“আমি মনে করি, এই বিধান জরুরি। কারণ দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নাই।”

দুদকের কর্তৃপক্ষও তাদের কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া চাকরিচ্যুতির বিধান বাতিল করতে রাজি নয় বলে জানা গেছে।

এমনকি এখন শরীফ উদ্দিনের চাকরিচ্যুতির বিষয়ে অন্য কর্মকর্তারা যে প্রতিবাদ করছেন, দুদকের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সেই চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্তের পক্ষে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে একটা অস্থির পরিবেশ রয়েছে।