যেসব গুণে সৎ ব্যবসায়ী হওয়া যায়

রবিবার, নভেম্বর ৭, ২০২১

ঢাকা : যাঁরা সততার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন, মহান আল্লাহ তাঁদের বিশেষ সম্মাননা দেবেন। কেননা, সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করা নবী-রাসুলদের সুন্নত। তাই সৎ ব্যবসায়ী হতে কী কী গুণ অর্জন করতে হবে, তা জেনে নেওয়া উচিত। নিম্নে কোরআন-হাদিসের আলোকে সৎ ব্যবসায়ীর গুণগুলো তুলে ধরা হলো—

পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা

পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা সৎ ব্যবসায়ীর দায়িত্ব। একজন সৎ ব্যবসায়ী ক্রেতা হলে নিজের জন্য যে পণ্যটি পছন্দ করতেন, তার ক্রেতাদের জন্যও ঠিক সে রকম মানসম্মত জিনিসটা পছন্দ করাই তার কর্তব্য। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণ যাঁর হাতে তাঁর কসম! তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে থাকে।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৫০১৭)

ওজনের ব্যাপারে শতভাগ সতর্ক থাকা

একজন সৎ ব্যবসায়ী কখনো ওজনে কম দেবে না। তার ব্যবসা যদি সেবানির্ভর হয়, তাহলে সে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো কারচুপি করবে না। কারণ ওজনে কম দেওয়া, কারচুপি করার পরিণতি ভয়াবহ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি বিশ্বাস করে না যে তারা পুনরুত্থিত হবে। মহাদিনে, যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে!’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৬)

অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর হে আমার সম্প্রদায়, মাপ ও ওজন পূর্ণ কোরো ইনসাফের সঙ্গে এবং মানুষকে তাদের পণ্য কম দিয়ো না। আর জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)

ক্রেতার প্রতি উদার হওয়া

সৎ ব্যবসায়ীদের আরেকটি গুণ হলো, তারা ক্রেতাদের যতটুকু সম্ভব সহজ শর্ত দিয়ে ব্যবসা করে। ক্রেতাকে মানসম্মত পণ্য ক্রয় করতে সহযোগিতা করে। লেনদেন সহজ করে। যৌক্তিক কারণে কেউ পণ্য ফেরত দিতে চাইলে বিক্রীত মাল ফেরত নেয়। একে-অপরকে ঠকানোর ব্যাপারে মহান আল্লাহকে ভয় করে। এতে তাদের ব্যবসার বরকত হয়। কারণ এ ধরনের ব্যবসায়ীর জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করেছেন। জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিক্রয়কালে উদারচিত্ত, ক্রয়কালেও উদারচিত্ত এবং পাওনা আদায়ের তাগাদায়ও উদারচিত্ত, আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি দয়া করুন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২০৩)

এ ব্যাপারে হাদিস শরিফে খুব সুন্দর একটি সত্য ঘটনা রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্বকালে এক ব্যক্তি এক খণ্ড জমি ক্রয় করে তার মধ্যে সোনাভর্তি একটি কলস পায়। সে (বিক্রেতাকে) বলল, আমি তো তোমার থেকে জমি ক্রয় করেছি, সোনা কিনিনি। বিক্রেতা বলল, আমি তোমার কাছে জমি এবং তার মধ্যকার সব কিছু বিক্রয় করেছি। অতঃপর তারা বিষয়টির মীমাংসার জন্য এক ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হলো। লোকটি বলল, তোমাদের দুজনের কি সন্তান-সন্ততি আছে? একজন বলল, আমার একটি পুত্রসন্তান আছে। অপরজন বলল, আমার একটি কন্যা সন্তান আছে। লোকটি বলল, তাহলে তোমরা ছেলেটির সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দাও এবং এই সোনা তাদের দাও, যাতে তারা এটা নিজেদের প্রয়োজনে খরচ করতে পারে এবং দান-খয়রাতও করতে পারে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫১১) সুবহানাল্লাহ, বর্তমান যুগেও ক্রেতা-বিক্রেতা যদি একে অপরের হকের ব্যাপারে এরকম আন্তরিক হতো, তাহলে পৃথিবীর চেহারাটা পরিবর্তন হয়ে যেত।

সত্য বলা

পণ্য বিক্রির জন্য কখনো মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়া। আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীরা (আখিরাতে) নবীগণ, সিদ্দীকরা (সত্যবাদীরা) ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯) সৎ ব্যবসায়ীরা ব্যবসার জন্য ইমান নিলামে তুলবে না, তারা সর্বাবস্থায় সততা বজায় রেখে ব্যবসা করে, বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাদের ব্যবসায় বরকত দেন।

পাওনা আদায়ে নম্র হওয়া

উসমান ইবনে আফফান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা এমন এক ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়কালে, ঋণ প্রদান ও আদায়কালে লোকদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করত।’ (নাসায়ি, হাদিস : ৪৬৯৬)

বেশি কসম না করা

অনেকে আছে ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনের জন্য বেশি বেশি কসম করে। ইসলাম তা পছন্দ করে না। এতে ব্যবসার বরকত উঠে যায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা সৎকাজ এবং তাকওয়া ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপন থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহর নামের শপথকে অজুহাত করো না। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৪) আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, কসম মালের কাটতি বাড়িয়ে দেয়; কিন্তু আয় কমিয়ে দেয়। (নাসায়ি : ৪৪৬১)

ওয়াদা ও আমানত রক্ষা করা

সৎ ব্যবসায়ীর অন্যতম গুণ হলো, ওয়াদা ও আমানত রক্ষার ব্যাপারে শতভাগ যত্নবান হওয়া। পবিত্র কোরআনে সব মুমিনকে এই গুণগুলো অর্জনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ) আর যারা রক্ষা করে নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৮)

উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ এই গুণগুলোকে সফলতার চাবিকাঠি আখ্যা দিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা লেনদেনের ক্ষেত্রে বহু লোকের সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ থাকেন, অনেকের আমানত তাদের কাছে থাকে, এ বিষয়গুলো খুব যত্নের সহিত রক্ষা করা একজন সফল ব্যবসায়ীর গুণ। উল্লেখ, নিজ নিজ কর্মচারীর সঙ্গে কৃত ওয়াদা রক্ষা, তাদের হক ঠিকভাবে আদায় করাও একজন সফল ব্যবসায়ীর গুণ। কারণ ব্যবসায়ীর এগিয়ে চলার পথে তাদের শ্রম-ঘাম রয়েছে। তাদের ঠকিয়ে কোনোভাবেই সৎ ব্যবসায়ীর কাতারে থাকা সম্ভব নয়। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তার প্রতিটি বান্দা থেকেই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত নেবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং প্রতিশ্রুতি পালন করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৪)