ছাত্রদল থেকে আ’লীগ নেতা

টেন্ডার মানিকের কব্জায় রুয়েটের ঠিকাদারি কাজ

শুক্রবার, অক্টোবর ৪, ২০১৯

ঢাকা: মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক। রাজশাহীতে টেন্ডার মানিক নামেই পরিচিত। ছিলেন ছাত্রদল নেতা। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দলবদল করে ফেলেন মানিকও। বর্তমানে তিনি মতিহার থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

মানিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভেয়ার পদে চাকরি করেন। তবে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়টে) বড় বড় কাজের ঠিকাদারি করেন বেনামে। এখন তিনি বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। নির্মাণ করেছেন আলিশান বাড়িও। কিছুদিন পরপরই দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। থাকেন পাঁচ তারকা হোটেল-রিসোর্টে।

জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর মেহেরচণ্ডি এলাকার বিএনপি কর্মী ভ্যানচালক মনোয়ার হোসেনের ছেলে মানিক রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইন্সটিটিউট শাখার ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মানিক তৎকালীন মহানগর ছাত্রলীগের এক নেতার হাত ধরে ছাত্রলীগে ভিড়ে যান। এরপর তিনি বাগিয়ে নেন মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতির পদ। পরে মহানগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার আশীর্বাদে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীকে পেছনে ফেলে রাতারাতি টেন্ডার মানিক হয়ে যান মতিহার থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

রুয়েটের প্রকৌশল শাখার একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে টেন্ডার মানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেই রুয়েটের প্রায় ৭২ লাখ টাকার ছয়টি কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে আইকন এন্টারপ্রাইজের নামে ৩৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা, মেসার্স জনি ট্রেডার্সের নামে ৬ লাখ ২৬ হাজার, মেসার্স মাবরুকা ট্রেডার্সের নামে ১২ লাখ ৭৩ হাজার, বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজের নামে ১১ লাখ ৭০ হাজার ও মুক্তার হোসেনের নামে ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার কাজ। টেন্ডার ছাড়াই কোটেশনের মাধ্যমে এসব কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন টেন্ডার মানিক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রুয়েটের এক ঠিকাদার জানান, টেন্ডার মানিকের পার্টনার রুয়েটের দুই কর্মকর্তা। এরা হলেন- রুয়েটের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক, অফিসার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মুফতি মো. রনি এবং রুয়েটের মেকানিক্যাল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী, অফিসার্স সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও রুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক হারুন অর রশিদ।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে রুয়েট প্রশাসনকে অনেকটা জিম্মি করেই ওই দুই কর্মকর্তা টেন্ডার আহ্বান ছাড়াই দুর্নীতির মাধ্যমে টেন্ডার মানিকের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার কাজ করেন। মতিহার থানা আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানিয়েছেন, রাবিতে চাকরি করলেও মানিক দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান কর্মস্থলের বাইরে।

রুয়েটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করে জানান, সম্প্রতি রুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণের জন্য ৩৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেয়েছে।

এই প্রকল্পের আওতায় রুয়েটের তিনটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন, একটি ইন্সটিটিউট ভবন, একটি করে ছাত্রছাত্রী হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল পাঁচতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ, একটি শিক্ষক কোয়ার্টার, একটি শিক্ষক ডরমেটরি, একটি অফিসার্স কোয়ার্টার, একটি স্টাফ কোয়ার্টার, মেডিকেল সেন্টার ভবন ও উপাচার্যের বাসভবন নির্মাণ করা হবে। রুয়েটের এই ব্যাপক উন্নয়ন কাজ অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নিতে বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে টেন্ডার মানিকের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

এদিকে টেন্ডার মানিকের ফেসবুকের কভার পেজে রুয়েটের মূল ফটকের ছবিটি দেয়া হয়েছে। ঠিকাদার হিসেবে ওই ফটকটি বানিয়েছেন মানিক। অভিযোগের বিষয়ে মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক বলেন, আমার নামে কোনো ঠিকাদারি লাইসেন্স নেই। আমি কোনো ঠিকাদারি কাজের সঙ্গেও জড়িত নই। তবে চাকরির আগে বিএমডিএতে ঠিকাদার জাকারিয়া নামে এক ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করতাম।

রুয়েট কর্মকর্তা মুফতি মো. রনি বলেন, টেন্ডারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

অপর কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, কোনো অনিয়মের সঙ্গে আমি জড়িত নই। ঠিকাদারি কাজও আমি করি না। এগুলো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, প্রতিপক্ষ আমাকে অহেতুক ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।