যৌন নিপীড়নের স্বীকার জাবি শিক্ষার্থীর শিক্ষকের গুমোড় ফাঁস, বেরিয়ে আসছে থলের বেড়াল

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৯

সাঈদ ইবরাহীম রিফাত, জাবি প্রতিনিধি : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক কতৃক যৌন নিপীড়নের স্বীকার শিক্ষার্থী আরও বিস্তারিতভাবে শিক্ষকের হেনস্থা সম্পর্কে জানিয়েছেন। উল্লেখ্য গত ১৮ সেপ্টেম্বর অভিযোগ দাখিলের পর বিভাগ থেকে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ঐ ছাত্রী।

তার লিখিত অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, সানোয়ার সিরাজ ৩০৩ নং কোর্সের(কম্পারেটিভ পলিটিক্স অব লাতিন আমেরিকা) ক্লাস নিতেন। পরে ঐ শিক্ষার্থী মানোন্নয়ন পরীক্ষার জন্য সানোয়ার সিরাজের সাথে দেখা করতে গেলে সানোয়ার সিরাজ তাকে নিজের ব্যক্তিগত ফোন নাম্বার প্রদান করেন এবং ভাল মার্ক্স দিবেন আশ্বাস দিয়ে পরবর্তীতে যোগাযোগ করতে বলেন। গত ১২ মার্চ, ২০১৮ তারিখে উনি নিজে ওই শিক্ষার্থীকে ফোন করেন এবং ফেসবুক মেসেঞ্জারে তাকে একসাথে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

এতে ঐ শিক্ষার্থী হতবাক হয়ে যান এবং শিক্ষককে ফোন করে নিশ্চিত হন যে তার আইডি হ্যাক হয়েছে কিনা। পরে ওই শিক্ষক জানান, তিনি তার প্রতি আকর্ষণবোধ করেন এবং বহুদিন ধরে তাকে নোটিশ করছেন। এসব শুনে ঐ শিক্ষার্থী শিক্ষককে তিরস্কার করেন এবং ভবিষ্যতে এমন আচরণ করতে নিষেধ করেন।

তবে নাছোড়বান্দা ওই শিক্ষক সেখানেই ক্ষান্ত হন নি, তিনি তাকে ক্রমাগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যৌন নিপীড়ন করতে থাকেন। ওই পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ৪০৫ নং কোর্সের পরীক্ষার দিন সন্ধ্যা থেকে আমাকে কল দিয়ে যাচ্ছিলেন। একবার ধরে তার আপত্তিকর কথাবার্তা শুনে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন।

সেই রাতেই তাকে মেসেঞ্জারে নক করে তার ফোন কল ধরতে বলেন সেই শিক্ষক। রুমমেটকে শিক্ষকের আচরণের ব্যাপারে আগে থেকে জানিয়ে রেখেছিলেন সে শিক্ষার্থী। এরকম উত্ত্যক্তকরনের স্বীকার হবার ফলে তিনি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছিলেন না।

এরকম অবস্থায় প্রচন্ড অসহায়ত্ববোধ থেকে তিনি কান্না শুরু করেন। এমন অবস্থায় রুমমেট কি হয়েছে জানতে চাইলে তাকে পুরো বিষয় খুলে বলেন সেই শিক্ষার্থী। তার রুমমেট ওই শিক্ষককে এড়িয়ে চলতে অনুরোধ করেন এবং তাকে বলেন যে এ কারণে তার পরীক্ষায় কম নাম্বার আসতে পারে বলে সতর্ক করেন।

পরবর্তীতে ওই শিক্ষার্থী সানোয়ার সিরাজের এসব আপত্তিকর আচরণ তার পরিচিত বন্ধু বান্ধব,শিক্ষক এবং এক কর্মকর্তাসহ অনেককেই জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন অনেকে। সবাই তাকে পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। এহেন পরিস্থিতিতে তিনি পুনরায় রুমমেটের পরামর্শে সেদিন রাতে শিক্ষকের ফোন ধরেন। শিক্ষক তাকে বলেন, ‘আমি তোমার সবকিছু খেয়াল করি।

তুমি একই ড্রেস পড়ে পাঁচটা পরীক্ষা দিচ্ছো। আমি তোমাকে দুইটা ড্রেস গিফট করতে চাই। তুমি না করতে পারবে না।‘ তিনি তাকে গ্লোরিয়া জিনস ও ন্যান্দোস এ খেতে যাওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ভুক্তভোগী প্রত্যাখ্যান করলে অভিযুক্ত বলেন, ওহ তোমার তো পরীক্ষা, ঢাকা যেতে পারবে না, লন্ডোনাস রেস্টুরেন্টে চলো’, সম্ভব নয় বলার পর তিনি তাকে বলেন, আগামীকাল রাতে তোমার খাতা দেখবো। তাই তুমি তোমার রোল নম্বর পাঠিয়ে দাও।

‘ তার এসব কথা না শুনার ভান করে এড়িয়ে যেতে চাইলে তিনি আমাকে বলেন, ‘কাল সন্ধ্যায় একটু সাজগোজ করে আমার সাথে বেড়াতে চলো, তোমার সাথে ঘুরতে চাই।‘ আমি প্রত্যাখ্যান করলে পুনরায় বলেন,’আজ রাতে আমার স্ত্রী বাসায় নেই, তোমাকে জড়িয়ে সারারাত বসে থাকব। এক ঘন্টা ধরে তোমাকে টানা চুমু খেতে চাই।

‘ তার এসব আচরণ থেকে নিষ্কৃতি পেতে ওই শিক্ষার্থী বারবার তার শিক্ষক পরিচয় মনে করিয়ে দিয়ে বিরক্ত না করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তাও ওই শিক্ষক নাছোড়বান্দার মতো তার পেছনে লেগে থাকেন। ভুক্তভোগী বিষয়গুলো ডা. প্রফেসর মো আলী হোসেন ও সৈয়দ আতিকুল হককে জানান। তারা জানান, তার যাবতীয় অসুস্থতা এরকম মানসিক নিপীড়নের ফলেই হচ্ছে। তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে জানান এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে অভিযোগ জানাতে বলেন।

শিক্ষকের কুপ্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তার ৩০৩ নং কোর্সে কম নাম্বার প্রদান করেন ওই শিক্ষক। শিক্ষকদের এ বিষয়ে জানাতে গিয়ে শিক্ষক রাজনীতির স্বীকার হন এবং অধিকাংশ শিক্ষক উল্টো তার প্রতি বৈরী আচরন করেন। ভুক্তভোগী জানান তার কাছে ঐ শিক্ষকের সাথে হওয়া চ্যাটিং এবং ফোনকল রেকর্ড রয়েছে যেখানে ঐ শিক্ষক তাকে আপত্তিকর প্রস্তাব এবং আচরণ করে আসছিলেন।

তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি খন্দকার শামসুন্নাহার বিভাগীয় গোপনীয়তার স্বার্থে বিভাগে সংরক্ষণ করার নিশ্চয়তা প্রদান করে বলেন, তিনি আমাকে বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে নিশ্চয়তা প্রদান করে মেসেঞ্জার চ্যাটিংয়ের হার্ড কপিগুলো তার কাছ থেকে নিয়ে নেন। অথচ তার আগে বিভাগে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ক্তৃক আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি ভুক্তভোগীর উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে তিনি তার সমাপনী বক্তব্য দেন।

বক্তব্যে তিনি বলেন,’এটা ওপেন এবং পাব্লিক ফোরাম; এখানে একজন ছাত্রী এখানে যেসব অভিযোগ করছে সেসব বিভাগের মান সম্মানের সাথে জড়িত। এখানে তার দেওয়া দেওয়া অভিযোগ তথ্য প্রমাণের সাপেক্ষে লিখিতভাবে জানাতে হবে। তা না হলে ওই ছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবো।‘

আরো উল্লেখ্য, এক বছর পূর্বে সানোয়ার সিরাজের স্ত্রী শাহনেওয়াজ পারভীন ভুক্তভোগীর হলে বিধ্বস্ত অবস্থায় এসে তাকে জানান,’ সানোয়ার সিরাজ তাকে নির্যাতন করে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪২ ব্যাচের এক ছাত্রীকে বিয়ে করে ঢাকায় বসবাস করছেন। এবং তিনি এও জানতে পারেন, ওই শিক্ষইক একাধিক ছাত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত। সেসব মেয়েদের সাথে যোগাযোগ করে তার বিরুদ্ধে অশিক্ষকমূলক আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সাক্ষ্য দিতে।

এসব ব্যাপারে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক সানোয়ার সিরাজকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ এবং ফেসবুক আইডি ডিএক্টিভেট পাওয়া যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন সেলের প্রধান রাশেদা আখতার জানান, অভিযোগ পত্র পাওয়ার পর এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি, এ নিয়ে খুব দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে প্রশাসন।

উল্লেখ্য, এর আগে ৪১ তম আবর্তনের শিক্ষার্থী হামজা মোহাম্মদ অন্তরের যৌন নিপীড়নের স্বীকার হন এবং তা রাশেদা আখতার কে জানালে এ নিয়ে তিনি কটুক্তি করেন এবং ভুক্তভোগী এ নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতার স্বীকার হন।