শপথ নিলেন মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা

সোমবার, জানুয়ারি ৭, ২০১৯

ঢাকা: টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে বিকেলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালন করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা ৪৭ জন। এর মধ্যে পূর্ণমন্ত্রী রয়েছেন ২৪ জন, প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ১৯ জন। এছাড়া উপমন্ত্রী রয়েছেন তিনজন। গতকাল রোববার (৬ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ সদস্য শফিউল আলম মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের নাম ও দফতর ঘোষণা করেন।

অতিথিতে পূর্ণ বঙ্গভবনের দরবার হল: শপথ গ্রহণের জন্য দুপুরের পর থেকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা বঙ্গভবনে আসতে শুরু করেন। সঙ্গে আসেন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের পরিবার সদস্য ও স্বজনরা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, বঙ্গবন্ধু পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরাও শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শপথ অনুষ্ঠানে আসা আগের মেয়াদের বিদায়ী মন্ত্রীরা প্রথম সারিতে বসেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে তাদের জন্য ছিল আলাদা আসন।

শপথ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩টা ১৪ মিনিটে বঙ্গভবনে আসেন। বিকেল ৩টা ৩৩ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দরবার হলে আসেন। এ সময় বিউগলে সুর বেজে ওঠে। রাষ্ট্রপতি আসার পর ৩টা ৩৪ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

প্রথম শপথ প্রধানমন্ত্রীর: মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩টা ৩৯ মিনিটে শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ ও গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করেন। শপথ শেষে তিনি ৩টা ৪০ মিনিটে উভয় শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন শেখ হাসিনা।

এবারের মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায়িত্বে রয়েছে পাঁচ মন্ত্রণালয় ও এক বিভাগ। সেগুলো হচ্ছে- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে যারা শপথ নিলেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শপথগ্রহণ শেষে ৩টা ৪৮ মিনিটে একযোগে শপথবাক্য পাঠ করেন ২৪ জন মন্ত্রী। শপথ ও গোপনীয়তার শপথ শেষে তারা ৩টা ৪৯ মিনিটে শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আ ক ম মোজাম্মেল হক, ওবায়দুল কাদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ড. আবদুর রাজ্জাক কৃষি মন্ত্রণালয়, আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ড. হাছান মাহমুদ তথ্য মন্ত্রণালয়, আনিসুল হক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থ মন্ত্রণালয়, মো. তাজুল ইসলাম স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, ডা. দীপু মনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এ কে আবদুল মোমেন পেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

এছাড়া এম এ মান্নান পেয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন শিল্প মন্ত্রণালয়, গোলাম দস্তগীর গাজী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, জাহিদ মালেক স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্য মন্ত্রণালয়, টিপু মুনশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, নুরুজ্জামান আহমেদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ ম রেজাউল করিম গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, মো. শাহাব উদ্দিন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, বীর বাহাদুর উ শৈ সিং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ভূমি মন্ত্রণালয় ও নুরুল ইসলাম সুজন রেলপথ মন্ত্রণালয়। টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন দু’জন। এর মধ্যে ইয়াফেস ওসমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং মোস্তাফা জব্বার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় পেয়েছেন। তারাও এ সময় শপথবাক্য পাঠ করেন।

১৯ প্রতিমন্ত্রীর শপথ: বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নিয়েছেন ১৯ প্রতিমন্ত্রী। বিকেল ৩টা ৫৪ মিনিটে প্রতিমন্ত্রীরা শপথ ও গোপনীয়তার শপথ নেন। এরপর ৩টা ৫৫ মিনিটে তারা শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন।

শিল্পমন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কামাল আহমেদ মজুমদার, ইমরান আহমেদ চৌধুরী প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জাহিদ আহসান রাসেল যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, নসরুল হামিদ বিপু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়, আশরাফ আলী খান খসরু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মুন্নুজান সুফিয়ান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, জাকির হোসেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শাহরিয়ার আলম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জুনাইদ আহমেদ পলক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, ফরহাদ হোসেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বপন ভট্টাচার্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, জাহিদ ফারুক পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মুরাদ হাসান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শরীফ আহমেদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কেএম খালিদ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, এনামুর রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, মাহবুব আলী বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ শপথ নিয়েছেন।

শপথ নিয়েছেন তিন উপমন্ত্রী: বিকেল ৩টা ৫৭ মিনিটে শপথ নিয়েছেন তিন উপমন্ত্রী। বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন হাবিবুন নাহার পরিবেশ। এছাড়া একেএম এনামুল হক শামীম পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

মন্ত্রিসভা থেকে বাদ ছিলেন হেভিওয়েটরা: এবারের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট অনেক নেতা বাদ যান। মন্ত্রিসভা থেকে অবসরে গেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসে বর্তমান মন্ত্রীদের মধ্যে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় এবার মনোনয়ন পাননি।

এছাড়াও প্রথম দফা থেকে বাদ পড়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

আরও বাদ পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, খাদ্য মন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এ কে এম শাহজাহান কামাল।

বিদায়ী মন্ত্রিসভায় ছিলেন বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মো. মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।

বাদ পড়েছেন দুই উপমন্ত্রীও। এরা হলেন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আরিফ খান জয়। আরিফ খান জয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি।

নতুন মন্ত্রীসভায় জাতীয় পার্টির কেউ নেই। আগের মন্ত্রীসভায় দলটির তিনজন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার কারণে এবার তারা মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে না বলে শপথের পরদিনই দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জানিয়েছেন।

মহাজোটের শরীক জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি (জেপির) কেউই মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। আগের মন্ত্রিসভায় জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন ও জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। দলটি ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৫৭টিতে জয় পায়। আর তারা জোটগতভাবে পেয়েছে ২৮৮টি আসন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে মাত্র সাতটি আসন।

নির্বাচনে জয়ের পর সংসদ সদস্যরা ৩ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওইদিনই রাষ্ট্রপতি সরকার গঠনের জন্য শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানান।