সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ১৬

রবিবার, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৮

ঢাকা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতায় সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নিহতদের মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কর্মী ছাড়াও একজন আনসার সদস্য রয়েছেন।

শনিবার রাত থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কুমিল্লায় দুজন, চট্টগ্রামে দুজন, রাজশাহীতে দুজন নিহত হয়েছেন।

এছাড়া রাঙ্গামাটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর, নোয়াখালী, নাটোর, নরসিংদী, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে একজন করে নিহতের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুমিল্লা

কুমিল্লায় এক বিএনপি কর্মীকে পিটিয়ে ও একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

রোববার সকালে কুমিল্লা-১০ আসনে (নাঙ্গলকোট) বাচ্চু মিয়া (৪৮) নামে এক বিএনপি কর্মীকে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাঙ্গলকোট থানা পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এ ছাড়া সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা-৭ চান্দিনা আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষে মজিবুর রহমান (৩৫) নামে এক বিএনপিকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।

বেলাশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।

চান্দিনা থানা পুলিশের ওসি মো. ফয়সাল ঘটনার সত্যতা নিশ্চত করে বলেন, ময়নাতদন্তের পর বলা যাবে কার গুলিতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর

শনিবার রাত ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে অজ্ঞাত এক যুবক (৩৫) নিহত হয়েছেন।

নিহত ওই ব্যক্তির নাম ও পরিচয় জানা যায়নি।

এ ঘটনায় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক রাকিব হোসেন ও ১ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি মো. জহির গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

নাটোর

নাটোরের নলডাঙ্গা ও নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ভোট দেয়া কেন্দ্র করে একজন নিহত হয়েছেন।

জানা গেছে, নলডাঙ্গায় ভোট দিতে যাওয়া কেন্দ্র করে বিএনপি সমর্থক রতন আহমেদের ছুরিকাঘাতে আওয়ামী লীগ কর্মী হোসেন আলীর মৃত্যু হয়েছে।

রোববার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার সমাস খলসি দিয়ারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত হোসেন আলী সম্পর্কে রতন আহমেদের চাচা বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিতে আহমদ কবীর (৪৫) নামে জাতীয় পার্টির এক কর্মী নিহত হয়েছেন।

শনিবার রাতে বাঁশখালী পৌরসভার কাথারিয়া ইউনিয়নের বড়ইতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

রাতে কেন্দ্র দখল নিয়ে আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির কর্মীদের সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে।

বাঁশখালী থানা পুলিশের ওসি কামাল হোসেন ঘটনা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, এ ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া একই দিন (শনিবার) রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের পটিয়ায় দ্বীন মোহাম্মদ (২৮) নামে এক যুবলীগ কর্মী নিহত হয়েছেন।

উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের গোরনখাইন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের দাবি, ওই ব্যক্তিকে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন কুপিয়ে হত্যা করেছে।

তবে বিএনপির অভিযোগ, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

রাঙ্গামাটি

রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বাছির উদ্দীন (৩৫) নিহত হয়েছেন।

কাউখালী থানা পুলিশের ওসি মঞ্জুর আলম যুগান্তরকে জানান, ভোটগ্রহণের আগে দুদলের সংঘর্ষে যুবলীগ নেতা বাছির উদ্দীনের মৃত্যু হয়।

রাজশাহী

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের মোহনপুর উপজেলায় নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে মিরাজ উদ্দিন নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়েছেন।

রোববার বেলা ১১টার দিকে মোহনপুরের পাকুন্দিয়া বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) আবদুর রাজ্জাক খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অপরদিকে, রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের তানোর উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় মোদাচ্ছের আলী (৪০) নামে এক আওয়ামী লীগ নেতা নিহত হয়েছেন।

দুপুর ১২টার দিকে পাঁচন্দর ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মোদাচ্ছের আলী মোহাম্মদপুর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে।

তিনি পাঁচন্দর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের হামলায় তিনি মারা গেছেন বলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

এ ঘটনার পর ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মোরশেদ আলী মৃধা ভোটগ্রহণ স্থগিতের কথা নিশ্চিত করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সদর উপজেলার নাটাই (উত্তর) ইউনিয়নে একটি ভোটকেন্দ্রে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইসরাইল মিয়া (১৯) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।

রোববার বেলা ১১টার দিকে ইউনিয়নের রাজঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ সময় ইসরাইল গুলিবিদ্ধ হন।

নিহত ইসরাইল ওই ইউনিয়নের রাজঘর গ্রামের ছাওয়াল মিয়ার ছেলে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি।

বগুড়া

বগুড়ার কাহালু উপজেলার নন্দিগ্রামে বাগইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্বাচনী সহিংসতায় আওয়ামী লীগের কর্মী আজিজুল হক (৩২) নিহত হয়েছেন।

বেলা সাড়ে ১১টায় কাহালু নন্দিগ্রামের বাগইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

বিষয়টি কাহালু থানার ওসি শওকত কবীর নিশ্চিত করেছেন।

নরসিংদী

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় মিলন মিয়া নামে আওয়ামী লীগেরর এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার কুন্দলপাড়া ভোটকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নের বাইশকাইল গ্রামে আবদুল আজিজ (৭০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত আজিজ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বলে স্থানীয়রা জানালেও পুলিশ বলছে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন।

গোপালপুর থানা পুলিশের ওসি হাসান আল মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

দিনাজপুর

দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় ভোট দিয়ে যাওয়ার পথে পড়ে গিয়ে কিনা মোহাম্মদ (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন।

দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার শহরগ্রাম মন্ডলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত কিনা মোহাম্মদ (৬৫) বিরল উপজেলার ৪ নং শহরগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত চান্দু মোহাম্মদের ছেলে।

বিরল থানার ওসি এটিএম গোলাম রসুল বলেন, কিনা মোহাম্মদ হার্টফেল করে মারা গেছেন। কোনো অভিযোগ না থাকায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নোয়াখালী

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্র দখল নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নুরনবী (৪৫) নামে এক আনসার সদস্য নিহত হয়েছেন।

রোববার দুপুর ১টার দিকে আলাইয়াপুর ইউনিয়নের তুলাচারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনি নিহত হন।

নিহত নুরুননবীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আমানউল্লাহপুর কৃষ্ণরামপুর গ্রামের বাসিন্দা বলে জানায় নিহতের স্বজনরা।

বেগমগঞ্জ থানার ওসি ফিরোজ আমিন মোল্লা জানান, নির্বাচন চলাকালীন দুপক্ষের সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। তার লাশ উদ্ধার করে হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

গাজীপুর

গাজীপুর মহানগরের হাড়িনাল এলাকায় রোববার দুপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় একজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তি হলেন কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি মো. লিয়াকত হোসেন (৪০)।

তিনি মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাতি মাসুদ রানা এরশাদের বড় ভাই।

আহতরা হলেন স্থানীয় যুবলীগ কর্মী মো. আশরাফ (৪০) ও খায়রুল ইসলাম (৪০)।

মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য রফিজ উদ্দিন জানান, দুপুর দেড়টার দিকে অর্ধশত উঠতি বয়সের যুবক হাতে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহানগরের গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজ ফটক, কাজি আজিম উদ্দিন কলেজ ও আশেপাশে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। পরে তারা স্থানীয় হাড়িনাল উচ্চ বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের বাইরে বসে থাকা ওই তিনজনের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। এতে ওই তিনজন আহত হন। তাদেরকে প্রথমে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে লিয়াকত হোসেন বুকে ও ডান হাতে, আশরাফ এবং খায়রুলের মাথায় গুরুতর জখম হন। গুরুতর অবস্থায় লিয়াকত এবং আশরাফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

স্থানীয় আল নুর হাসপাতালের মালিক মো. হাবিবুর রহমান জানান, আহত লিয়াকতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে উত্তরার লেক ভিউ হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে সেখানে তিনি মারা যান।

গাজীপুর সদর থানার সমীর চন্দ্র সূত্রধর লিয়াকতের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানান, হতাহতের ঘটনাটি পূর্ব শত্রুতা নাকি নির্বাচনী সহিংসতা তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।