নবাবগঞ্জে হোটেলে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা: নিখোঁজ ১

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮

ঢাকা : ঢাকার নবাবগঞ্জে একটি হোটেলে অবস্থানরত যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সোমবার রাতে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

ভাংচুর করা হয়েছে ১৮টি গাড়ি ও হোটেলের বিভিন্ন কক্ষ। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন যুগান্তরের সাংবাদিক শামীম খান। রাত ২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে গেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য ওই হোটেলে অবস্থান করছিলেন সাংবাদিকরা।

সোমবার রাত ১১টার দিকে নবাবগঞ্জে থানা রোডে শামীম গেস্ট হাউসে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র হামলাকারীরা প্রায় ঘণ্টাখানেক অবরুদ্ধ করে রাখে গণমাধ্যমকর্মীদের। এ সময় স্থানীয় থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি ন্যক্কারজনক এ ঘটনা পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে থানা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ নেননি।

অথচ থানার কাছেই এ গেস্ট হাউস অবস্থিত। তবে এক ঘণ্টা পরে পুলিশের একটি টহল গাড়ি ঘটনাস্থলে আসে। ওই সময় নবাবগঞ্জ থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক কামরুল ইসলাম বলেন, যা ঘটেছে তা দুঃখজনক। এর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এছাড়া টানা তৃতীয় দিনের মতো ঢাকা-১ (নবাবগঞ্জ-দোহার) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের নির্বাচনী জনসভা ও নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

রোববার মধ্যরাত থেকে সোমবার রাত পর্যন্ত নবাবগঞ্জ ও দোহারের বিভিন্ন এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। গেস্ট হাউসে হামলার ঘটনা প্রসঙ্গে নবাবগঞ্জে অবস্থানরত যমুনা টিভির সাংবাদিক সুশান্ত সিনহা বলেন, অতর্কিত ৩০-৩৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী আমাদের হোটেলে হামলা চালায়।

আমরা থানা নির্বাহী অফিসার এবং ওসিকে জানালেও কোনো ধরনের সাড়া পাইনি। গণমাধ্যমকর্মীরাই যদি এভাবে আক্রান্ত হন, তাহলে এখানে সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা কোথায়?

হামলার ঘটনায় যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদক মিজান মালিক জানান, হামলাকারীরা ১৩ থেকে ১৪টি কক্ষে ভাংচুর করেছে। এ সময় তাদের হাতে ছিল রামদা, হকিস্টিক ও স্টিলের লাঠিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।

হামলাকারীরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে হামলা চালায়। তারা মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কারসহ প্রায় ১৭ থেকে ১৮টি বিভিন্ন মডেলের গাড়ি ভাংচুর করে। ওই হোটেলে যুগান্তর ও যমুনা টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ৪০ থেকে ৪৫ জন সাংবাদিক ছিলেন।

জানা যায়, নবাবগঞ্জে শামীম গেস্ট হাউসের সামনে সোমবার হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে একটি নির্বাচনী ক্যাম্প তৈরি করা হয়। তারপর রাতেই ন্যক্কারজনক এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার সময় সন্ত্রাসীরা গালাগাল করে আর হুমকি দেয় যে, তোরা কার জন্য কাজ করতে এসেছিস। তোদের মেরে ফেলব।

যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার ইয়াসিন রহমান জানান, আমরা কয়েকজন চা খাওয়ার জন্য হোটেল থেকে নিচে নামি। এ সময় সিঁড়ি থেকেই শোনা যায় নিচে হট্টগোলের শব্দ। আমরা প্রথমে মনে করেছি আরও নতুন কোনো সাংবাদিক হয়তো হোটেলে আসছেন তাদের জন্যই এ হট্টগোল। কিন্তু নিচে গিয়ে দেখি রড, হকিস্টিক ও দেশীয় অস্ত্রসহ মুখোশপরা কয়েকজন যুবক উপরের দিকে হামলার জন্য আসছে। আমরা তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে দৌড়ে উপরে উঠে যাই। এরপর সন্ত্রাসীরা প্রায় ঘণ্টাখানেক হামলা-ভাংচুর চালায়।

শামীম গেস্ট হাউসের ম্যানেজার মো. জুয়েল জানান, সন্ত্রাসীরা তার ওপর ন্যক্কারজনকভাবে হামলা করে। তাকে ব্যাপক মারধর করে তার মোবাইল ফোন সেটটিও ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তারা গেস্ট হাউসের টিভি ও আসবাবপত্র ভাংচুর করে এবং তাণ্ডব চালায়। তিনি বলেন, সশস্ত্র হামলাকারীদের ভয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই ঘটনার পর শামীম খান নামে একজন সাংবাদিককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি হোটেলেই ছিলেন এবং হামলাকারীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

যুগান্তরের সাংবাদিক শিপন হাবীব জানান, এটা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। আমরা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। হামলাকারীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

যমুনা টিভির সাংবাদিক আবদুল্লাহ তুহিন বলেন, সকালে পুলিশ সুপারের কাছে হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কা জানিয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, যে গেস্ট হাউসে হামলার ঘটনা ঘটেছে সেখান থেকে নবাবগঞ্জ থানার দূরুত্ব সামান্যই। থানার এত কাছাকাছি সন্ত্রাসীরা হামলা করে যাওয়ার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে আসতে অনেক সময় নিয়েছে। এ ঘটনায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেটা ঘটেছে সেটা কারো কাম্য নয়। কোনোভাবে যাতে শান্তিশৃঙ্খলায় বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

নিন্দা : হামলার ঘটনায় নিন্দা জ্ঞাপন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক দীপু সারোয়ার তার ফেসুবকে লিখেছেন, ‘আমাদের বন্ধু, সহকর্মী, বড়ভাই ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-ক্রাবের নবনির্বাচিত সহসভাপতি মিজান মালিক, নবনির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, সিনিয়র সদস্য যুগান্তরের নেসারুল হক খোকন, যমুনা টিভির আবদুল্লাহ তুহিন, ইমতিয়াজ সনি নবাবগঞ্জে নিরাপদে নেই। নির্বাচনের রিপোর্ট করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা-হুমকির মুখে তারা। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।

সালমা ইসলামের নির্বাচনী সভা ও ক্যাম্পে হামলা ভাংচুর : সালমা ইসলামের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়ার কারণে ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যানসহ অনেক নেতাকর্মীকে হুমকি দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের পক্ষ থেকেও নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো অব্যাহত আছে। এসব ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও মটরগাড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম।

জানা যায়, সোমবার দুপুরে দোহার লটাখোলা এলাকায় সালমা ইসলামের নির্বাচনী সভায় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে সন্ত্রাসীরা। দুপুর আড়াইটার দিকে ২০-৩০ জন সন্ত্রাসী সভার মঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, মাইকসহ বিভিন্ন উপকরণ ভেঙে ফেলে।

এ সময় সভায় আসা কর্মী ও সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সভাস্থল থেকে বিতাড়িত করে সরকারি দলের নামধারী ক্যাডাররা। বেলা ৩টার দিকে সালমা ইসলাম ঘটনাস্থলে এলে ভোটার ও সমর্থকরা একজোট হয়ে সভাস্থলে পুনরায় ফিরে আসেন। এরপর শুরু হয় সভা। এ সময় ভোটার ও সমর্থকরা সালমা ইসলামকে সাহস জুগিয়ে বলেন, ‘আপনি আমাদের মা-বোনের মতো।

যতই হুমকি-ধমকি, ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগ করা হোক না কেন আমরা আপনার পক্ষে আছি। আমরা কাউকে ভয় পাই না। আমরা এ অন্যায়ের জবাব দেব ৩০ ডিসেম্বর মটরগাড়ি মার্কায় ভোট দিয়ে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে ২০-২৫ যুবক লাটিসোটা নিয়ে মঞ্চসহ চেয়ার-টেবিল ভেঙে ফেলে। তারা বলেন, কিন্তু যখনই ঘটনাস্থলে আমাদের প্রিয় নেত্রী সালমা ইসলাম এসে উপস্থিত হন তখন আমরা সভাস্থলে হাজির হই।

মটরগাড়ি মার্কার সমর্থক মিলন খান জানান, সন্ত্রাসীদের এমন হামলা ও ভাংচুরেও আমরা শঙ্কিত নই। বরং তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে সালমা ইসলামের ভোট আরও বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও একজন কর্মী জানান, দোহারের একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এসব হামলার ঘটনা ঘটছে। আমরা সব জানি। এর জবাব জনগণ তাকে দেবে।

নবাবগঞ্জের দিঘিরপাড় এলাকায় সালমা ইসলামের দুটি নির্বাচনী ক্যাম্পে রোববার মধ্যরাতে হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। তারা নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দিয়ে পোস্টার ও ব্যানার পুড়িয়ে দেয়। ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা মটরগাড়ি প্রতীকের কর্মী নূর হোসেন এ তথ্য জানিয়ে যুগান্তরকে বলেন, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ক্যাম্পে হামলা করে।

এদিকে নয়নশ্রী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রিপন মোল্লা অভিযোগ করে প্রতিবেদককে বলেন, ‘শনিবার রাতে পুলিশ সাদা পোশাকে আমার বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে বলেছে যেন আমি মটরগাড়ি প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ না নেই। পুলিশ আমার বৃদ্ধ বাবাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ঘরের আসবাবপত্র তছনছ করে। সরকারি দলের কয়েকজন নেতাও তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে।

এছাড়া বর্ধনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপি কর্মী আসলাম অভিযোগ করেন, রোববার রাতে নবাবগঞ্জ থানা থেকে পুলিশ আমার বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে বলেছে নির্বাচনের আগে যেন আর ঘরে না ফিরি। তাই ভয়ে আমি বাড়িতে যেতে পারছি না। তিনি আরও জানান, সন্ত্রাসীরা তার ভাই নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ ওসমানী এবং তার স্ত্রীকেও শাসিয়ে গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল যুগান্তরকে বলেন, অনেকের বিরুদ্ধেই নাশকতার মামলা রয়েছে। এ কারণে পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা করছে। কিন্তু যদি তারা জামিনে থাকেন তাহলে কেন আমরা গ্রেফতার করব। তিনি দাবি করেন, কাউকে হুমকি দেয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনী প্রস্তুতি বৈঠক : সোমবার নবাবগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠকে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারাও অংশ নেন। এতে ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের সব কর্মকর্তা যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেন বলে জানা গেছে।