বহির্বিশ্বে চাহিদা মন্দায় বিপাকে দেশের চিংড়ি শিল্প

রবিবার, ডিসেম্বর ২৩, ২০১৮

ঢাকা: বিশ্ববাজারে হিমায়িত চিংড়ি ও চিংড়িজাত পণ্যের চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় দেশের চিংড়ি শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার ৯০ শতাংশই অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে। চিংড়ি শিল্প খাতের হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চললেও বেশির ভাগ কোম্পানি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বহির্বিশ্বে চাহিদা মন্দার কারণে বিগত ও চলতি বছর বন্ধ হয়ে গেছে এ খাতের অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সম্ভাবনাকে ঘিরে গত কয়েক দশকে খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে চিংড়ি চাষ ও উৎপাদন শিল্প। হোয়াইট গোল্ড হিসেবে পরিচিতি চিংড়ি প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শতাধিক কোম্পানি। রফতানিনির্ভর শিল্পটি বিশ্ববাজারে নেতিবাচক পরিবর্তনে সাম্প্রতিক সময়ে বিপাকে পড়েছে। খুলনা অঞ্চলে গড়ে ওঠা চিংড়ি খাতের শতাধিক কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৬৫টি।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন মোট চালু আছে প্রায় ১১০টি চিংড়ি কারখানা। এসব কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। যদিও গত অর্থবছরে এ সক্ষমতার ৯০ শতাংশই অব্যবহূত থেকে গেছে। তার আগের বছর ব্যবহূত হয়েছিল সক্ষমতার মাত্র ১৫ শতাংশ। গত অর্থবছরে চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ১৬৮ টন।

জানা গেছে, চিংড়ি খাতে উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। একইভাবে বহির্বিশ্বেও হিমায়িত চিংড়ি ও চিংড়িজাত পণ্যের চাহিদা কমেছে। এদিকে বিশ্ববাজারে বাগদার পরিবর্তে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা বাড়লেও এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয় নেমে এলে বিপাকে পড়বে আর্থিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান। শুধু খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি শিল্পে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এ খাতের কারখানাগুলো রুগ্ণ হলে বিপাকে পড়বে ব্যাংকগুলো।

এ বিষয়ে বিএফএফইএ পরিচালক ও আছিয়া সি ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম জহির ঢবলেন, বাংলাদেশের হিমায়িত চিংড়ি রফতানি খাতের অবস্থা বর্তমানে খুবই নাজুক। স্বাধীনতার পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ খাতে রফতানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও কয়েক বছর ধরে নেমেছিল স্থবিরতা। এরপর বর্তমানে চিংড়ি খাত হয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে নিম্নমুখী। ফলে একদিকে যেমন দেশের রফতানি আয় কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে হিমায়িত খাদ্য রফতানি কারখানাগুলোও দিন দিন রুগ্ণ থেকে রুগ্ণতর হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে শিল্পোদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়ে পড়বেন। শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও কৃষক বেকার হয়ে পড়বেন। এজন্য ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন দেয়ার পাশাপাশি ভেনামি চিংড়ি চাষের অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়াতে সরকারকে ব্যাপক ভূমিকা নিতে হবে।

রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে দেখা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি রফতানি প্রায় ৫৫ হাজার টনে পৌঁছে। তবে রফতানির ওই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০১০-১১ অর্থবছরের পর থেকে চিংড়ি রফতানি কমতে কমতে ২০১৬-১৭ সালে নেমে আসে ৩৯ হাজার টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন হিমায়িত চিংড়ি রফতানি হয়, যার মূল্য ছিল ৫৫ কোটি ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ২৭৮ টন। এ থেকে আয় হয় ৫১ কোটি ডলার। এরপর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪০ হাজার ২৭৬ টন হিমায়িত চিংড়ি রফতানি হয়। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে চলতি বছর। মাসওয়ারি বিশ্লেষণে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে রফতানির চিত্র বেশ হতাশাজনক। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালের এ সময়ে রফতানির পরিমাণ কমেছে ২ হাজার ৩১৭ টন। আর রফতানি বাবদ আয় কমেছে ২৭ লাখ ৭১ হাজার ৭৫২ ডলার।

এ বিষয়ে বিএফএফইএ সভাপতি মো. আমিন উল্লাহ বলেন, গত বছর হঠাৎ করে গলদা চিংড়ির দাম পড়ে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। আবার চলতি মৌসুমে হঠাৎ বাগদার দামও পড়ে যায়। উপরন্তু ক্রেতা দেশগুলো থেকে অর্ডারের পরিমাণও অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। আমাদের প্রতিযোগী প্রতিবেশী দেশগুলো এরই মধ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভেনামির মাধ্যমে বাড়তি উৎপাদনশীল জাত চাষ করে রফতানি বহু গুণ বাড়িয়েছে। ওই চিংড়ির হেক্টরপ্রতি উৎপাদনশীলতা ১০-১৫ টন। কিন্তু আমাদের দেশে উৎপাদন হচ্ছে তিন-চার টন। ভেনামি জাতের চিংড়ির কারণে প্রতিযোগী দেশগুলোর উৎপাদন খরচও আমাদের তুলনায় অনেক কম। এ কারণে দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে কেজিপ্রতি ২-৩ ডলার কম দামে বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা করতে পারে। কিন্তু আমরা সে সুযোগ নিতে পারছি না।

এফএও ও গ্লোবাল অ্যাকুয়াকালচার অ্যালায়েন্সের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক চিংড়ির বাজার ছিল মূলত বাগদাপ্রধান। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বের কমপক্ষে ৬২টি দেশে ভেনামির চাষ হচ্ছে সফলভাবে। এর মধ্যে এশিয়ার দেশ রয়েছে ১৬টি।

রফতানিকারকরা জানান, কম দামের হওয়ায় বিশ্ববাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা ব্যাপক। ২০১৭ সালে মোট ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ভেনামি চিংড়ি ছিল ৭৭ শতাংশ বা প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টন।