শেষ বিকালের তদবিরে আ.লীগ বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২২, ২০১৮

ঢাকা: ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতি ততই হয়ে উঠছে নির্বাচনমুখর। আসন্ন এ নির্বাচনে কার্যত মূল লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।

দেশের রাজনীতিতে বড় এ দুটো দলে এখন প্রার্থী চূড়ান্তকরণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে শেষ মুহূর্তেও পাল্টে যেতে পারে ছক, যোগ কিংবা বিয়োগ হতে পারে অনেক প্রার্থীর নাম। সঙ্গত কারণেই চূড়ান্ত তালিকায় নিজ-নিজ নামটি নিশ্চিত করতে দুই দলেরই মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে নেমে পড়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে চলছে স্নায়ুর লড়াই।

দিনের শেষভাগ হচ্ছে শেষ বিকাল। এর পরই ফুরিয়ে যায় দিন, নিভে যায় আলো, নামে সন্ধ্যা। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ক্ষেত্রেও এখন সময় শেষ বিকাল। এর পরই ফুরিয়ে যাবে সময়। শেষ বিকালের এ লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসতে তাই তারা নেমেছেন আদাজল খেয়ে। আর তাদের এ লড়াইয়ের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে তদবির ও লবিং। সঙ্গত কারণেই দলের নীতিনির্ধারক ও প্রভাবশালী নেতারাও এখন ভুগছেন যারপরনাই তদবির বিড়ম্বনায়।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্যেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দলের চূড়ান্ত প্রার্থীতালিকার সংবাদ দেখে আরও বেশি সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। তারা বলছেন, প্রার্থীতালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে। চেষ্টা চালাতে তো দোষ নেই।

বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডে প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার চলছে। আজকালের মধ্যে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া শুরু হবে। এ জন্য শেষ মুহূর্তে এসে প্রভাবশালী নেতাদের কাছে যাচ্ছেন তারা। তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হাওয়া ভবনের সাবেক কর্মকর্তারাও মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন এমন খবরে তাদের কাছে জোর তদবির চালাচ্ছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, সব প্রার্থী মনে করেন, তিনিই প্রার্থী হিসেবে যোগ্য। নেতাদের কাছে যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাইছেন। কিন্তু এবার যিনি বিজয়ী হবেন, তাকেই প্রার্থী করা হবে। অর্থাৎ মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘উইনিং প্রার্থী’ কিনা সেটাই বিবেচনা করা হবে সর্বাগ্রে।

আওয়ামী লীগ : আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, দলীয় প্রার্থীদের তদবির বিড়ম্বনায় তারা অফিস বা বাড়িতে কোথাও দম ফেলার ফুরসুতটুকু পর্যন্ত পাচ্ছেন না। এমপি, সাবেক এমপি আর এমপি পদপ্রত্যাশীরা আসছেন তাদের সঙ্গে দেখা করতে। তার সংসদীয় আসনে কে পাচ্ছেন মনোনয়ন? তিনি নিজে কি বাদ পড়ছেন? প্রত্যেকের মুখেই এমন সব প্রশ্ন। আর সব কথার সারাংশ যা দাঁড়ায়, তা হচ্ছে, তিনিই প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে যোগ্য। তাকে মনোনয়ন না দেওয়া হবে খুবই পীড়াদায়ক। দলীয় দৃষ্টিতে এসব তথ্যাদি খুবই স্পর্শকাতর। তাই তা এড়াতে রীতিমতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা!

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের এক সদস্য সঙ্গে আলাপকালে বলেন, প্রার্থীতালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু পরিবর্তন আসছে। যেমন প্রথমদিনের বৈঠকে যেসব প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছিল, দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে তাদের অনেকেরই পরিবর্তন হয়েছে। আমরা ধারণা করছি, চূড়ান্ত ঘোষণার আগ পর্যন্ত আরও অনেক প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গতকাল রাতে বলেন, জাতীয় পার্টি এবং জোটের অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনার পর আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। এখনো কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

দলটির মনোনয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল বোর্ডের পরবর্তী বৈঠক ডাকা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২৩ নভেম্বরের মধ্যেই জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ হবে এবং এর পর পরই চূড়ান্ত প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করা হবে। জাতীয় পার্টির সঙ্গে সোমবার রাতেই বৈঠকে বসার কথা ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কিন্তু দলটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ গুরুতর অসুস্থ থাকায় বৈঠকটি হয়নি।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রক্রিয়া কবে শেষ হচ্ছে এমন প্রশ্নে গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের দলীয় মনোনয়ন শেষ। এখন জোটের শরিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি ভাগাভাগির বিষয় নিয়ে। ২৭ তারিখ পর্যন্ত সময় আছে, তার আগে ২৪ বা ২৫ নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হাল ছাড়ছেন না। অনেকেই মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের অনুরোধ করছেন। কেউ কেউ খোদ গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করছেন, কথা বলে আসছেন। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হক আসলাম একাদশ সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন, এমন গুঞ্জন শোনার পর এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অন্যতম একজন যুব মহিলা লীগ নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিন গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। তিনি আমাদের সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, নেত্রী আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। আমি এখনো আশাবাদী মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক ছাত্রনেতা মাসুদ দুলাল সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমাদের আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে শুনেছি। দলীয় প্রার্থী হিসেবে আমার নাম চূড়ান্ত তালিকায় আছে। জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনার পর নেত্রী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগ পর্যন্ত আমি আশাবাদী।

বিএনপি : স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী অন্তত তিনজন সদস্যের বাসভবনে এখন মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের ভিড়। ময়মনসিংহ-১০ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী এক নেতাকে বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার বাসায় দেখে ‘কেন এসেছেন?’ প্রশ্ন করা হলে তার জবাব ছিল, ‘দোয়া নিতে এসেছি।’

আজ বুধবার বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শেষ হবে। এর পর শুরু হবে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়ার পালা। তাই শেষ মুহূর্তে লবিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন নেতারা।

জানা গেছে, সংস্কারপন্থি নেতাদের আসনে গত ১০ বছর ধরে কাজ করে আসছেন অনেক নেতা। তাদের অনেকেই মামলা-হামলার শিকার, কারাবরণও করেছেন কেউ কেউ। সম্প্রতি দলের তাঁবুতে ফিরে আসার পর সংস্কারপন্থিরাও নিজ নিজ আসনে এখন শক্তিশালী প্রার্থী। এ কারণে সংস্কারপন্থিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন প্রার্থিতা পেতে ইচ্ছুক ত্যাগী নেতারা। বলছেন, তারা কতটা নির্যাতন-নিপীড়নের মুখেও দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন।

এ বিষয়ে কথা হয় বরিশাল অঞ্চলের এক নেতার সঙ্গে। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দলের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করছি। মামলা-হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরছি। কারাবরণ করেছি অন্তত ৫ বার। অথচ আমি যে আসনে, সে আসন থেকে এখন মনোনয়ন পেতে আদাজল খেয়ে লেগেছেন সংস্কারপন্থি এক নেতা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন জানান, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী এক নেতার জন্য স্থায়ী কমিটির এক সদস্য ফোনে তদবির করেছেন বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের এক সদস্যকে। ব্যবসায়ী ওই নেতার পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেছেন তিনি। আবার মনোনয়ন নিশ্চিত এমন এক প্রার্থী সম্প্রতি হেনস্তার শিকার হয়েছেন। অনেকটা বাধ্য হয়ে প্রার্থিতার দৌঁড় থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন তিনি।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানান, ৩০০ আসনে দলীয় প্রার্থী কদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এর পর শরিক দলের মধ্যে যারা উইনিং প্রার্থী, তাদের জন্য ছাড় দেবে বিএনপি এবং তার পরই ঘোষণা করা হবে চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা।আস