বাবা ও শ্বশুরকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো>>জামুকায় তবুও বহাল এডি শাহ আলম

সোমবার, অক্টোবর ৮, ২০১৮

ঢাকা: বাবা মোসলেহ উদ্দিন ও শ্বশুর বজলে কাদিরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সহকারী পরিচালক (এডি) শাহ আলম।

সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে এ তথ্য। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৮ মাস আগে ‘অবিলম্বে’ শাহ আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দেয়া হয়।

কিন্তু জামুকা নথি সরবরাহ না করায় এত দিনেও মামলা করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। নথি চেয়ে তাগিদপত্র দেয়া হলেও পাত্তা দিচ্ছে না সংস্থাটি। নিজ পদেও বহাল রয়েছেন শাহ আলম। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক শনিবার বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে রয়েছে। আজ-কালের মধ্যে বিদেশ যাচ্ছি। ১৩ অক্টোবর দেশে ফেরার পর ব্যবস্থা নেব।’

শাহ আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করতে ১ ফেব্রুয়ারি জামুকায় চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে জামুকার সহকারী পরিচালক শাহ আলমের বিরুদ্ধে অমুক্তিযোদ্ধা বাবা ও শ্বশুরের নামে গেজেট প্রকাশ ও মুক্তিযোদ্ধার সনদ তৈরির অভিযোগ আনা হয়। বিষয়টি তদন্ত করতে দায়িত্ব দেয়া হয় মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মইনুল হক আনছারীকে। দীর্ঘ ৬ মাস তদন্ত করে সম্প্রতি প্রতিবেদন দিয়েছেন তিনি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

এ ঘটনার ৮ মাস পার হলেও শাহ আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়নি জামুকা। ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয় থেকে জামুকাকে তাগিদপত্র দেয়া হয়। এতে বলা হয়, শাহ আলমের বিরুদ্ধে অমুক্তিযোদ্ধা বাবা ও শ্বশুরের নামে গেজেট প্রকাশ ও মুক্তিযোদ্ধার সনদ তৈরির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজুর জন্য অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর খসড়া চেয়ে ২০ মে চিঠি দেয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী ও জামুকা চেয়ারম্যান খুবই ক্ষুব্ধ। তাই স্বার্থান্বেষী মহল শাহ আলমের সংশ্লিষ্ট নথি গোপন করে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে। যাতে এ সরকারের মেয়াদ শেষ হলে নতুন মন্ত্রী এলে ইস্যুটি চাপা দেয়া যায়। চাহিত নথি না দিয়ে ২ আগস্ট উল্টো মন্ত্রণালয়ের কোন শাখা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে তা জানাতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় জামুকা।

মন্ত্রণালয়ের তাগিদপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করে জামুকার মহাপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘শাহ আলম প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট নথি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

তদন্ত প্রতিবেদনে ‘অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণী’তে বলা হয়, শাহ আলম ওই দফতরে যোগ দেয়ার পর থেকেই কতিপয় অপরাধীর সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তিনি একই সঙ্গে সহকারী পরিচালক প্রশাসন ও অর্থের দায়িত্ব পালন করেন।

সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তার অমুক্তিযোদ্ধা বাবা ও শ্বশুরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছেন। বিষয়টি ২০১৫ সালের ২১ মার্চ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে ২০১৬ সালের ৫ মে দুদকে অভিযোগ করেন জামুকার তিন গাড়ি চালক।

দুদকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযোগটি তদন্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব কায়সারুল আলমকে। পরে ওই দায়িত্ব দেয়া হয় একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মইনুল হক আনছারীকে।

আনছারীর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত নিয়মে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্তির আবেদন উপকমিটিতে যাচাই-বাছাই হয়ে জামুকার সভায় অনুমোদিত হয়। মোসলেহ উদ্দিন ও বজলে কাদিরের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া শেষে মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ ঘটনা। ঊর্ধ্বতন মহল থেকে জোরালো তদবির বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রক্রিয়াগত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা গেজেট প্রকাশ সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না।

বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি সামাজিক মূল্য বাড়ায়, রাষ্ট্রীয় আইনে আর্থিক সুবিধাও পাওয়া যায়। চাকরির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীরা সুবিধা পান। ফলে কোনো ব্যক্তির মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে তার নিজের বা উত্তরাধিকারীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকা যৌক্তিক।

মোসলেহ উদ্দিন ও শাহ আলম উভয়ই মোসলেহ উদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্তির বিষয়ে ওয়াকিবহাল। জামুকাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপালন অবস্থায় বাবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্তিতে শাহ আলমের সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান হয়।

অন্যদিকে বজলে কাদির ও জামুকাতে কর্মরত তার মেয়ে খালেদা খাতুন বলেন, মুক্তিযোদ্ধার দাবি করা হয়নি, গেজেটভুক্তির আবেদনও করা হয়নি, কারও কাছে তদবিরও করা হয়নি। খালেদা খাতুনের বাহ্যিক অভিব্যক্তি তার সম্পৃক্ততা প্রতীয়মান করে না। ফলে বজলে কাদিরের তালিকাভুক্তিতে জামুকায় কর্মরত নিকটাত্মীয় জামাতা সহকারী পরিচালক শাহ আলমের সংশ্লিষ্টতা প্রতীয়মান হয়। প্রসঙ্গত, মোসলেহ উদ্দিন ও বজলে কাদির উভয়ের ক্ষেত্রে শাহ আলমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উত্তরাধিকারিত্বের সুবিধাভোগের সুযোগ বিদ্যমান।

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন